হিমালয়ের কোলে পাহাড় থেকে ধেয়ে আসছিল বিশালাকার পাথর আর ৮০ ফুট উঁচু কাদা-পানির তোড়। জীবন বাঁচানোর একমাত্র উপায় ছিল পিছল কাদামাখা খাড়া পাহাড় বেয়ে ওপরে ওঠা। সেই চরম সংকটময় মুহূর্তে কাছে থাকা একটি সাধারণ শাড়ি দিয়েই কাদা থেকে প্রাণ বাঁচালেন প্রবীণ ২১ জন পুণ্যার্থী।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে প্রলয়ংকরী বানের মুখে পড়ে প্রাণ নিয়ে শুক্রবার রাতে চেন্নাই ফিরেছেন তামিলনাড়ুর এই ২১ পুণ্যার্থী। পুনর্জন্ম পাওয়া এই দলের অনেকেই এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না কীভাবে কাদা, কাঁটাঝোপ আর মৃত্যুপুরী পেরিয়ে তারা ঘরে ফিরেছেন।
কুম্বকোনমের এক ভ্রমণ সংস্থার মাধ্যমে তিনটি বাসে চড়ে মোট ৫৭ জন পুণ্যার্থী রসুয়া হয়ে তিব্বতের দিকে যাচ্ছিলেন। এর মধ্যে ২১ জন আরোহী থাকা দ্বিতীয় বাসটি রাস্তায় কাদায় আটকে সামান্য সময়ের জন্য মেরামতের জন্য থামে। সেই কয়েক মিনিটের বিলম্বই তাদের জীবন বাঁচিয়ে দেয়। দলের সদস্য কাবিলদাস জানান, হঠাৎ বোমার মতো বিকট শব্দে গাড়ি ও রাস্তার ওপর পাথর পড়তে শুরু করে। যেন বাঁধ ভেঙে পানির তোড় ধেয়ে এলো।
গাড়িতে কাদা ঢুকতে শুরু করলে নেপালি ড্রাইভার সবাইকে নেমে ওপরে দৌড়াতে বলেন। বাসে থাকা ৫০ বছরের বেশি বয়সী পুণ্যার্থীরা এক তলা সমান উঁচু কাদামাখা পাহাড়ে ওঠার চেষ্টা করতেই পিছলে চার-পাঁচ ফুট নিচে পড়ে যেতে থাকেন। ঠিক সে সময় দলের নারী সদস্য পুনগোডি পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হন। তিনি দ্রুত নিজের সোয়েটার পরে গায়ের শাড়িটি খুলে নিচে ঝুলিয়ে দেন।
আরেক পুণ্যার্থী ভুবনেশ্বরী জানান, আমরা সেই শাড়ি এবং সেখানে থাকা একটি ক্যাবল শক্ত করে ধরে ওপরের দিকে উঠতে থাকি। শেষে এক নারী কিছুতেই উঠতে পারছিলেন না। আমরা তার কোমরে শাড়িটি বেঁধে সবাই মিলে টেনে ওপরে তুলে নিই। এই দলের আরেকজন সত্যান জানান, তিসুনামির মতো ধেয়ে আসা ওই দৃশ্যের কথা তারা শুধু ইংরেজি সিনেমাতেই দেখেছিলেন।
চূড়ায় উঠে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর একটু পানি ও বিস্কুট পান তারা। পাহাড় চড়ার সময় তারা কাদায় আটকে থাকা এক ব্যক্তিকে হাত নেড়ে সাহায্য চাইতে দেখে উদ্ধারকারীদের খবর দেন, যাকে পরে উদ্ধার করা হয়। পরদিন তিন ঘণ্টার সংকীর্ণ ও বিপজ্জনক পথ হেঁটে হেলিপ্যাডে পৌঁছান তারা। একটু ভুল হলেই ৫০ ফুট নিচে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। পথ ভুল করলে এক নেপালি ব্যক্তি তাদের সঠিক পথ দেখান। অবশেষে নেপাল সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডু ও দিল্লি হয়ে চেন্নাই পৌঁছান তারা।
ভাগ্যক্রমে ২১ জন বেঁচে ফিরলেও, এই দলের বাকি ৩৬ জন পুণ্যার্থীর কোনও খোঁজ মিলছে না। এছাড়া তিব্বত সীমান্তে অভিবাসন ভবনে থাকা চেন্নাইয়ের আরও ৪৯ জন পুণ্যার্থীর দল নিখোঁজ রয়েছেন। তামিলনাড়ুর মন্ত্রী এ রাজমোহন জানিয়েছেন, তামিলনাড়ু থেকে নেপালে যাওয়া ৪০০ জনেরও বেশি মানুষের মধ্যে এখনও ৯০ জনের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয়ের নির্দেশে মন্ত্রীরা উদ্ধার অভিযান সমন্বয় করতে দিল্লিতে অবস্থান করছেন।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস