টানা ২৮৬ দিন সমুদ্রে কাটানোর রেকর্ড বিরতিহীন মিশনের পর অবশেষে থাইল্যান্ডের পাতায়ায় নোঙর করেছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নাবিকরা। দীর্ঘদিনের কঠিন ও ক্লান্তিকর দায়িত্ব শেষে স্বস্তি পেতে শহরটির কালার নেইল পার্লারে পেডিকিউর করাতে ভিড় জমিয়েছেন নারী-পুরুষ নাবিকরা।
ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধের অংশ হিসেবে মোতায়েন থাকা এই রণতরীটি সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে শিরোনাম হয়েছিল সেখানকার নিম্নমানের জীবনযাত্রা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসংকটের খবরের জন্য। এমনকি জাহাজে আত্মহত্যার চেষ্টার মতো খবরও এসেছে। জাহাজের ক্যাপ্টেন তাজা ফল ও সবজির ঘাটতির কথা স্বীকার করলেও পরিস্থিতি নিয়ে করা প্রতিবেদনগুলোকে অতিরঞ্জিত বলে দাবি করেন। তবে ছুটিতে আসা নাবিকদের কণ্ঠে ভেসে উঠেছে ভিন্ন সুর।
নাম গোপন রাখার শর্তে এক নাবিক জানান, জাহাজে থাকাটা ছিল পরিবার নিয়ে এক ঘরে আটকে থাকার মতো। আর সবচেয়ে কঠিন ছিল খাবার খাওয়া। অনেক সময় তাকে কাঁচা গরুর মাংস এবং কাঁচা আলু কেটে দেওয়া হতো, যা গলায় আটকানোর মতো অবস্থা তৈরি করতো। তার মতে, দীর্ঘ মোতায়েন নয়, বরং ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চলাকালীন যুদ্ধের পরিস্থিতির কারণেই জীবনযাত্রার মান এতটা নিচে নেমেছিল।
আরেক নাবিক জানান, সব কষ্টের মাঝেও মানসিক ভারসাম্য টিকিয়ে রাখা ছিল সবচেয়ে কঠিন। তবে দীর্ঘদিন পর ডাঙ্গায় পা দিয়ে চাপমুক্ত বোধ করছেন বলে জানান ডেন নামের এক নাবিক। অন্যদিকে লেস্টার নামের এক নাবিক বলেন, ‘কাজটি কঠিন ছিল কিন্তু আমাদের তো দায়িত্ব পালন করতেই হতো’। প্রথম রাতে থাই খাবার পেটপুরে খেয়ে থাই খাবারের ভক্ত হয়ে গেছেন বলেও জানান তিনি। আরেকজন বলেন, দীর্ঘদিনের এই পরিস্থিতির সঙ্গে সবাই মানিয়ে নিতে পারে না।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ও বৃষ্টিপাতের কারণে থাইল্যান্ডের পর্যটন ব্যবসা যখন মন্দার মুখে, তখন আব্রাহাম লিংকনের ৫ হাজার নাবিকের আগমন শহরটির অর্থনীতিতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। পাতায়ার মেয়র পোরামেত এনগামপিচেত জানান, প্রতিটি মার্কিন সেনা যদি দিনে ১০০ থেকে ১৫০ ডলার খরচ করেন, তবে এই সফর থেকে প্রায় ১০০ মিলিয়ন থাই বাট (৩ মিলিয়ন ডলার) আয় হতে পারে। স্থানীয় বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আমেরিকানদের স্বাগত জানিয়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের ব্যানার টাঙিয়েছে।
পোশাকের দোকান ‘আমেরিকান ঈগল’-এর কর্মী পুয়াংবুপফা দুয়াংস্রি জানান, অফ-সিজনে যেখানে দিনে ৭০ হাজার থাই বাট বিক্রি হতো, সেখানে নাবিকরা আসার পর বুধবার এক দিনেই ২ লাখ বাটের বেশি বিক্রি হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরের মধ্যেই তা লাখ ছাড়িয়ে যায়। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, তারা কি আরও এক সপ্তাহ অতিরিক্ত থাকতে পারে না?
পাতায়া শহরটি তার নাইটলাইফ ও রেড লাইট ডিস্ট্রিক্টের জন্য পরিচিত হলেও নাবিকদের অনেকে ব্যস্ত ছিলেন ব্র্যান্ডেড শপ থেকে মোজা, স্ত্রীর জন্য হ্যালো কিটি পুতুল কিংবা বার্গার কিং-এ বার্গার খাওয়ায়। বেশ কিছু স্থানীয় ছোট ব্যবসায়ী এখনও কাঙ্ক্ষিত খদ্দের না পেলেও বড় ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রি একলাফে অনেক বেড়ে গেছে।
নাবিকদের পাতায়ার বিতর্কিত ‘সোই ৬’ এলাকার বিয়ার বারগুলোতে সূর্যাস্তের পর যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে স্ট্রিপ ক্লাব ও গো-গো বার সমৃদ্ধ বিখ্যাত ‘ওয়াকিং স্ট্রিল’-এ চলাফেরায় কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। সেখানে বিশালাকার নিয়ন সাইনে মার্কিন নাবিকদের স্বাগত জানানো হয়েছে। একটি বারের কর্মী জানান, নাবিকদের উপস্থিতিতে বিক্রি বাড়লেও বার-গার্লদের সঙ্গে তাদের মেলামেশায় বেশ সতর্কতা দেখা গেছে।
উল্লেখ্য ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাদের বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পর থেকেই একটি শান্ত জেলেপাড়া থেকে আধুনিক প্রমোদ শহর পাতায়ার রূপান্তর ঘটেছিল।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান