১২ বছরের শিশু তসেরিং ক্যামেরার লেন্সের দিকে সোজা তাকিয়ে আছে। চারপাশে জমা হওয়া মানুষ আর ক্যামেরার সরঞ্জাম দেখে তার ভেতরে কাজ করছে এক তীব্র কৌতূহল। সে এখনও জানে না, তার চারপাশের সবাই যে সত্যটি ইতোমধ্যে জেনে গেছে।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে হিমবাহ ধস ও শিলাখণ্ড ভেঙে নদীর উপত্যকায় নেমে আসা বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যায় গৃহহীন হয়ে পড়া শত শত মানুষের একজন তসেরিং। ওই এক বন্যায় নেপালেই ১,৩০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, নিখোঁজ হাজারও মানুষ এবং মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে একের পর এক গ্রাম। কাঠমান্ডুতে বড় খালা মিংমার দোলমা এবং তার বাবার মায়ের সঙ্গে আশ্রয় নেওয়া তসেরিংয়ের মা কাম্মি ও বাবা ফুরসাং- দুজনেই মারা গেছেন। তবে তসেরিংকে এখনও সেই খবর দেওয়া হয়নি।
তার অভিভাবকরা তাকে বলেছেন, তার বাবা-মা বনের মধ্যে কোথাও আটকা পড়ে আছেন। রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তাদের ফিরতে এক বা দুই বছর সময় লাগতে পারে। শিশুটি তাদের এই কথা বিশ্বাস করেছে। কখনও কখনওঃ বড়দের কাঁদতে দেখে সে কারণ জিজ্ঞেস করে এবং নিজেও কেঁদে ফেলে। বড় খালা মিংমার দোলমা চোখের জল চেপে বলেন, তার বাবা-মা আর এই পৃথিবীতে নেই। কিন্তু তসেরিং এখনও তাদের ঘরে ফেরার পথ চেয়ে অপেক্ষা করছে।
বন্যা ও ধসে ঘরবাড়ি এবং রাস্তা-ব্রিজ হারিয়ে রসুয়া অঞ্চল থেকে আসা প্রায় ৫২০ জন দুর্গত এখন কাঠমান্ডুর একটি বৌদ্ধ আশ্রমে আশ্রয় নিয়েছেন। এখানে প্রতি পদে কেবলই স্বজন হারানোর বেদনা। প্রবীণদের দীর্ঘশ্বাস কিংবা সন্তানদের পাহারায় থাকা অভিভাবকদের নীরবতায় কেবলই হারিয়ে যাওয়া জীবনের হাহাকার।
তবে জীবন থমকে থাকেনি। আশ্রমে প্রবেশের পথেই একটি তথ্যকেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে নতুন আসা মানুষের নাম নথিভুক্ত করা হচ্ছে- যা হয়তো স্বজনদের খোঁজে থাকা পরিবারগুলোকে সাহায্য করবে। ভেতরে চিকিৎসকদের দল, সুপেয় পানি, বাথরুম ও যৌথ খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেঝে ও প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে প্রবীণ, নারী ও শিশুরা একসঙ্গেই আহার করছেন। বিশাল এই অস্থায়ী কমিউনিটি কিচেনের জন্য চালের বস্তা, শাকসবজি ও পানির বোতল সারি সারি করে রাখা রয়েছে।
আশ্রমে আসা শিশুদের জন্য যেন এক ভিন্ন জগৎ গড়ে তোলা হয়েছে। একটি ট্রাম্পোলিন, ফুটবল, ছোট ছোট তাঁবু এবং তাতে জমানো খেলনা ও মেধা বিকাশকারী গেম। বয়সে একটু বড় শিশুরা যখন খোলা মাঠে দৌড়াদৌড়ি করছে, তখন ছোটরা তাঁবুর ভেতরে নিজেদের খেলায় মগ্ন। খেলাধুলার এই কয়েকটা মুহূর্ত হয়তো অতীত ফিরিয়ে আনবে না, তবে বন্যা এবং স্বজন হারানোর বিভীষিকা থেকে এই শিশুরা কিছুক্ষণের জন্য হলেও মুক্তি পায়।
৪০ বছর বয়সী শ্যাম বাহাদুর তামাং তার পরিবার নিয়ে ৩৫ বছর ধরে নিজের পৈতৃক ভিটায় বসবাস করছিলেন। গত ২৬ আগস্ট গ্রামের দিকে যাওয়ার সময় তিনি ফোনে জানতে পারেন বিধ্বংসী বন্যা আসছে। খবর পেয়ে মোটরসাইকেল থামিয়ে নিজ গ্রামের দিকে তাকাতেই দেখেন সবকিছু চোখের সামনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
বাড়িতে তার মা, বড় ভাই ও বড় মেয়ে ছিলেন। বন্যা দেখতে পেয়ে বড় ভাই তার ভাইয়ের মেয়েকে প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দিতে বলেন। মেয়েটি দ্বিধা করলে ভাই তাকে ধাক্কা দিয়ে উঁচু নিরাপদ স্থানে পাঠাতে সক্ষম হন। মেয়েটি বেঁচে গেলেও তার চোখের সামনেই ভেসে যায় তাদের ভিটেবাড়ি, ঠাকুরমা ও কাকা। মাকে একা ফেলে রেখে আসতে না পেরে বড় ভাইও মায়ের সঙ্গেই থেকে যান এবং পানির তোড়ে ভেসে যান। শ্যাম বলেন, কোন ছেলে মাকে ফেলে পালিয়ে আসতে পারে? শ্যামের স্ত্রী ও সন্তান আশ্রমে বেঁচে থাকলেও তার মা ও ভাই আর নেই। তার দীর্ঘদিনের বাসস্থান, আশপাশের বাজার এবং সংলগ্ন তিনটি বসতভিটা পুরো ধুয়ে-মুছে গেছে। স্বজন হারিয়ে নিঃস্ব শ্যামের একটাই প্রশ্ন- আমরা কীভাবে আবার ঘর তুলব? টাকা কোথায় পাব? আগে আমরা সুন্দর জীবন কাটাতাম, এখন আমরা পুরোপুরি শূন্যে এসে ঠেকেছি।
আশ্রমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা বুজুং নিজেও হারিয়েছেন তার আত্মীয়স্বজন ও পুরো গ্রামকে। তার নিজ গ্রামের ৪৩টি পরিবারের বন্ধন অত্যন্ত নিবিড় ছিল। বন্যায় তার পরিবার ও নিকটাত্মীয়সহ ৫০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন। বিপর্যয়ের সময় বুজুং বাইরে ছিলেন এবং বিদ্যুৎ বা নেটওয়ার্ক না থাকায় স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেননি।
এখন আশ্রমে অন্যদের সাহায্য করার পাশাপাশি নিজ গ্রাম ও পরিজনদের হারানোর বেদনায় তিনিও কাঁদেন। বুজুং একের পর এক আলোকচিত্র টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখতে শুরু করেন। এতে রয়েছে গ্রামবাসী, মা-বাবা, শিশু, ভাই-বোন ও বন্ধুদের মুখ। একসময় ছবি রাখতে গিয়ে পুরো টেবিলের জায়গা শেষ হয়ে যায়। প্রতিটি ছবি একটি প্রাণ ও একটি পরিবারের বিলুপ্ত হওয়ার গল্পের সাক্ষ্য দিচ্ছে।
আশ্রমের একটি বিশাল হলঘরে সারি সারি দোতলা বাঙ্কার বেড সাজানো রয়েছে। যেখানে নিজেদের ঘর হারিয়ে আসা মানুষরা ব্যাগ ও কম্বল নিয়ে ঘুমাচ্ছেন।
সন্ধ্যা নামতেই আশ্রমে নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা। খেলা শেষে ক্লান্ত শিশুরা ঘুমাতে যায়, আর বড়রা আশ্রয় নেন নিজেদের বাঙ্কার বেডে। কারও হাতে শুধুই ছবি, কারও কাছে বার্তা আসার অপেক্ষায় থাকা সচল একটি ফোন, আর কারও কাছে শুধুই স্মৃতি। আশ্রমে আশ্রয় নেওয়া ৫২০ জন মানুষ যেন তাদের হারিয়ে যাওয়া অতীত এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মাঝখানে ঝুলন্ত অবস্থায় আটকে আছেন। কারও অপেক্ষা স্থায়ী ঠিকানার, কারও ধ্বংস হওয়া রাস্তা চালুর সংবাদের, আর ১২ বছরের শিশু তসেরিংয়ের অপেক্ষা কেবল সেই দুজন মানুষের জন্য- যারা আর কোনোদিনই ফিরে আসবেন না।
সূত্র: এনডিটিভি