সাধারণত বিনোদন বা উপভোগের সাথে যে দেশটির নাম সহজে মেলানো যায় না, সেই উত্তর কোরিয়ায় এখন বইছে বিনোদনের নতুন হাওয়া। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন নাগরিকদের সম্পদ খরচ করার জন্য নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন। চীন থেকে আসা কাস্টমস ডেটা অনুযায়ী, গত এক দশকে উত্তর কোরিয়ায় ম্যাসাজ সরঞ্জামের আমদানি ৪০ গুণ এবং ট্রেডমিলের শিপমেন্ট ৬০০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এছাড়া প্রচুর পরিমাণে পিয়ানো ও বাম্পার কার বা বিনোদনমূলক গাড়িও দেশটিতে প্রবেশ করছে।
বাণিজ্য পরিসংখ্যান এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন পর্যালোচনা ছাড়াও পাঁচ জন সাম্প্রতিক ভিজিটর ও দুই জন দলত্যাগী ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই ভোগ্যপণ্যের জোয়ার লাক্সারি মল, সমুদ্র সৈকত ও স্কি রিসোর্ট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল জীবনের ছোটখাটো বিলাসিতা বাড়ানোর বিষয় নয়। সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা বিনোদন ও খুচরা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ব্যয়কে পরিচালিত করার মাধ্যমে কিম বাণিজ্যের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও সুদৃঢ় করছেন, অনানুষ্ঠানিক বাজারগুলোকে সংকুচিত করছেন এবং পারমাণবিক শক্তিধর এই দেশের জন্য রাজস্ব ও প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস উন্মোচন করছেন।
সিউলভিত্তিক থিংক ট্যাংক হুন্দাই রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফেলো কাং সিওং-হিউন জানান, এই কৌশলের মাধ্যমে বাজারে ঘনীভূত উৎপাদন, বণ্টন এবং মূলধন প্রবাহকে রাষ্ট্র পরিচালিত একটি আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক পরিসরে টেনে আনা হচ্ছে। অস্ত্র কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে বিলাসপণ্য, জ্বালানি ও খনিজ বাণিজ্যের ওপর জাতিসংঘের কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়ায় ভোগের সুযোগ ক্রমশ বাড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি ৩.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা টানা তৃতীয়বারের মতো ৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি।
রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের এই পরিবর্তন বিদেশিদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত মে মাসে পিয়ংইয়ং সফরের পর সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান রাজধানীর অগ্রগতিকে ‘অসাধারণ’ বলে অভিহিত করে জানান যে এটি পূর্ব এশিয়ার যেকোনও আধুনিক শহরের মতোই মনে হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই করা ভিডিও অনুযায়ী, পিয়ংইয়ংয়ে গত বছর চালু হওয়া রাংনাং আইজুক কুমগাং সার্ভিস কমপ্লেক্স নামক বিলাসবহুল মলে বাসিন্দারা কফি পান করছেন এবং হোম অ্যাপ্লায়েন্স দেখছেন। এছাড়া রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রশংসিত হুয়াসং তাইদংগাং বিয়ার রেস্তোরাঁতেও ভিড় জমাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। গত এপ্রিলে কিম তার মেয়ে কিম জু আয়ের সাথে একটি নতুন পোষা প্রাণীর দোকান পরিদর্শন করেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষকদের মতে, ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি, ইউক্রেনে রাশিয়ার পক্ষে লড়াই করার জন্য সেনা মোতায়েন এবং কয়লা ও অন্যান্য খনিজ রফটানির মাধ্যমে প্রাপ্ত রাজস্ব দিয়ে পিয়ংইয়ংয়ের এই বিনোদন উৎসবের অর্থায়ন করা হচ্ছে। সিউলভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজির প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া ১,৪৪৫ কোটি ডলার পর্যন্ত উপার্জন করেছে।
অর্থের এই প্রবাহ উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে প্রবেশ করেছে, যেখানে অনেকে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের মাধ্যমেও অর্থ উপার্জন করেছেন। তবে সঞ্চয় থাকা সত্ত্বেও ব্যয় করার জায়গা না থাকায় প্রায় ৮০ লাখ মানুষের একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হয়েছে বলে জানান ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব এশীয় অর্থনীতি ও সমাজের অধ্যাপক রুডিগার ফ্রাঙ্ক। তার মতে, ভোগই হলো কিমের এর উত্তর; এটি মানুষের হতাশা কমায়, চালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি রোধে অর্থ অন্যত্র চালিত করে এবং দেশীয় চাহিদার মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি তৈরি করে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির কারণে উত্তর কোরিয়ার এখন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রয়োজনীয়তা বা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পরমাণু আলোচনা পুনরায় শুরু করার তাগিদ কমে গেছে, যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিমের সাথে আরেকটি বৈঠকের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। বেইজিংয়ে উত্তর কোরিয়ার দূতাবাস, রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি। তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার সাথে বাণিজ্য ও সহযোগিতা বজায় রেখেছে এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে যেন দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত না হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন আকর্ষণ চালু বা সংস্কার হওয়ার পর থেকে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে পর্যটন, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক জীবন নিয়ে আলোচনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে চালু হওয়া ওনসান কালমা বিচ রিসোর্ট, চীনা সীমান্তে সামজিয়ানে পাঁচটি বিলাসবহুল হোটেল, একটি স্কি রিসোর্ট এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি ওয়াটারপার্ক। গত আগস্টে তীব্র দাবদাহের সময় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ওনসান বিচ রিসোর্টে দেশীয় পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। ট্যুর এজেন্সি ইয়ং পাইওনিয়ার ট্যুরসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা রোয়ান বিয়ার্ড জানান, স্থানীয় এক পরিচিত ব্যক্তি তাকে জানিয়েছেন যে সেখানে পরিবার নিয়ে যাওয়ার সময় অন্য সব রুম বুক হয়ে যাওয়ায় তাদের একটি টুইন রুম শেয়ার করতে হয়েছিল। চীনের দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে ওনসান কালমা রিসোর্টে ৩ লাখেরও বেশি দেশীয় পর্যটক এসেছিলেন।
উত্তর কোরিয়ায় উপলব্ধ পণ্যের পরিসরও প্রসারিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিন জন সাম্প্রতিক আগন্তুক। রিউগং গোল্ডেন প্লাজায় রোল্যাক্স, ওমেগা ও হারবেলিনের মতো ঘড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের লোগো এবং হুয়াওয়ে ব্র্যান্ডিংযুক্ত ইলেকট্রনিক্স শপ দেখা গেছে। মার্কিন থিংক ট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষণ প্রকল্প এনকেটেকল্যাব এবং বিয়ার্ডের প্রকাশিত ছবি অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার বাসিন্দারা চীনের আলিপের মতো মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে অনলাইনে কেনাকাটা করেন।
বাণিজ্য পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ব্যক্তিগত পণ্য এবং রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বাধীন অবকাঠামো- উভয় ক্ষেত্রেই বিনোদনমূলক উদ্যোগের প্রসার ঘটেছে। চীনা কাস্টমস ডেটা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাইয়ের মধ্যে উত্তর কোরিয়া চীন থেকে ২০ হাজার ডলারের বেশি মূল্যের ৩ মেট্রিক টনেরও বেশি বাম্পার কার আমদানি করেছে। পিয়ংইয়ংয়ে চীনা আমদানির ওপর ভিত্তি করে একটি সমৃদ্ধ গাড়ি সংস্কৃতিও গড়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পেমেন্ট ও ডেলিভারি অ্যাপগুলো ব্যক্তিগত ব্যয়ের ওপর সরকারি নজরদারি নিশ্চিত করে। ২০২৩ সালে পিয়ংইয়ং প্রতিটি ব্যাংক ও দোকানকে ইলেকট্রনিক পেমেন্ট গ্রহণ বাধ্যতামূলক করে একটি আইন পাস করে। তবে এই ভোগবিলাসের বুমের সুফল সবাই পাচ্ছে না। গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার আগে পিয়ংইয়ংয়ে চালক হিসেবে কাজ করা ইয়াং ইল-চেওল জানান, তার মতো সাধারণ মানুষের নতুন রেস্তোরাঁ ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে প্রবেশাধিকার খুবই সীমিত। রাজধানীতে মুঠোফোনের ব্যবহার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লেও অনেকে সরকারের ওপর আস্থাহীনতার কারণে নগদ লেনদেন করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
সূত্র: রয়টার্স