ডলার ইস্যুতে ব্রিকসের প্রস্তাব কি সমর্থন করবে ভারত?

ভারতের আয়োজনে ২০২৬ সালের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে একটি স্পষ্ট বার্তা নিয়ে হাজির হচ্ছে স্বাগতিক নয়াদিল্লি। তা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ডলার বর্জনের যে কোনও বড় উদ্যোগে সায় দিচ্ছে না ভারত। চীন ও রাশিয়া যখন কৌশলগত প্রকল্প হিসেবে ডলারের ব্যবহার বন্ধের ওপর জোর দিচ্ছে এবং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা বিষয়টিকে নিজস্ব লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরছেন, তখন জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ভারত বিষয়টিকে শুরুতেই না করে দিচ্ছে।

তবে ডলারকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে নতুন কোনও মুদ্রা চালু না করলেও ভারত এক নতুন কারিগরি উদ্যোগের প্রস্তাব রাখছে। ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা (সিবিডিসি) নিজেদের মধ্যে যুক্ত করার মাধ্যমে বাণিজ্য ও পর্যটন সংক্রান্ত লেনদেন সহজ করার কথা ভাবছে তারা। এটি কোনও মুদ্রার বৈপ্লবিক পরিবর্তন নয়, বরং পেমেন্ট ব্যবস্থার একটি আধুনিকায়ন।

সম্প্রতি ওয়াশিংটনে কার্নেগি এনডাওমেন্টে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, ডলারকে লক্ষ্যবস্তু বানানো আমাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা কৌশলগত নীতির অংশ নয়। তিনি জানান, ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা নিয়ে ভারতের কিছু উদ্বেগ থাকলেও এটিকে প্রতিস্থাপনের কোনও প্রচারণা ভারত চালাচ্ছে না। ২০২৪ সাল থেকে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও আমিরাত জোটে যোগ দিলেও ভারত তার আগের অবস্থানেই অনড় রয়েছে।

গ্রান্ট থর্নটন ভারতের পার্টনার এবং ইকোনমিক অ্যাডভাইজরি লিড ঋষি শাহ বলেন, ঐতিহ্যগত অর্থে রাজনৈতিক ও আর্থিক অভিন্নতা ছাড়া কোনও একক মুদ্রা ব্যবস্থা ব্রিকসের মতো বৈচিত্র্যময় একটি জোটের জন্য অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কোনও দিক দিয়েই যুক্তিযুক্ত নয়।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক (আরবিআই) ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের এজেন্ডায় সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা (সিবিডিসি) সংযোগের একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব রাখার সুপারিশ করেছে। তবে ওয়াশিংটনের ক্ষোভ এড়াতে এবং ব্রিকস ও কোয়াড-এর সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে ভারত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই সিবিডিসি প্রস্তাবটিকে কেবল লেনদেনের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোয়ান্টিভ অ্যাডভাইজরি এলএলপির প্রতিষ্ঠাতা সোহম বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, চলতি ব্রিকস পেমেন্ট সংহতকরণের আলোচনাকে প্রায়ই খুব সংকীর্ণভাবে ডি-ডলারাইজেশনের প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়। প্রকৃত সুযোগটি রয়েছে লেনদেন খরচ, নিষ্পত্তির বিলম্ব এবং সীমিত আন্তর্জাতিক পেমেন্ট চ্যানেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর মধ্যে।

তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ব্রিকসের বাকি দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ২২৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ভারত জোটের দেশগুলো থেকে যতটুকু বিক্রি করে তারচেয়ে অনেক বেশি কেনে। তাই বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি থাকা অবস্থায় ডলারের পরিবর্তে রুপি বা ইউয়ানের ব্যবহারে সমস্যা মেটে না, বরং বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা একই থেকে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত মূলত এক বহুমুখী পদক্ষেপ বজায় রাখছে যেখানে দক্ষতার সুযোগ রয়েছে সেখানে ডলার ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া, বাণিজ্যপ্রবাহ সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে স্থানীয় মুদ্রায় নিষ্পত্তি বাড়ানো এবং পাইলটভিত্তিতে সিবিডিসি সংযোগ পরীক্ষা করা। এর মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে বিশ্ববাজারে ডলারকে রাতারাতি সরিয়ে নতুন কোনও ‘ব্রিকস কারেন্সি’ চালু করার ইচ্ছা ভারতের নেই।

সূত্র: এনডিটিভি