ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলে নবরাত্রির সময় নিরামিষ আহার ও উপবাসের চল থাকলেও, পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজার উৎসবে পাঁঠার মাংস বা মাছ খাওয়া এক বিশেষ স্থান দখল করে রয়েছে। মূলত পশ্চিমবঙ্গের শাক্ত ঐতিহ্য, খাদ্যাভ্যাস এবং দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বাঙালিদের পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক ভাবাবেগের কারণেই এই ভিন্নতা দেখা যায়।
রান্না বিশেষজ্ঞ ও শেফ অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যাখ্যা করেন, পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজা শাক্ত ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত। শাক্ত মতে দেবীকে অশুভ শক্তি বিনাশকারী মহাশক্তি হিসেবে পূজা করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে শাক্ত পূজায় পশু বলি ও মাংস উৎসর্গের প্রথা থাকলেও, এটি প্রতিটি পরিবার বা মণ্ডপে বাধ্যবাধকতামূলক নয়। অনেক পরিবারেই কঠোরভাবে নিরামিষ রীতি মেনে পূজা হয়। তবে অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, অনেকের কাছেই পূজার উৎসবমুখর খাবারের সঙ্গে খাসির মাংস গভীরভাবে যুক্ত।
দুর্গাপূজায় মাংস খাওয়ার অর্থই যে দেবীকে তা নিবেদন করা, বিষয়টি তেমন নয়। কলকাতার সিয়েনা’র প্রধান শেফ অভিনন্দন কুণ্ডু বলেন, বিশেষ কিছু শাক্ত ধারার পূজায় ভোগ হিসেবে মাছ বা মাংস দেওয়া হয়। তবে বেশিরভাগ সর্বজনীন মণ্ডপে মধ্যাহ্নভোজে সবার জন্য আমিষের ব্যবস্থা থাকলেও, দেবী দুর্গাকে তা ভোগ হিসেবে অর্পণ করা হয় না।
খাদ্যাভ্যাসের এই পার্থক্যের নেপথ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি গৃহস্থের গভীর আবেগ। হিন্দু বাঙালি কল্পনায় দুর্গাপূজা মানেই ঘরের মেয়ে ‘উমা’র বাপে বাড়ি ফেরা। শেফ অনন্যা বলেন, বাঙালির দুর্গোৎসব একই সঙ্গে আরাধনা এবং এক বড় আনন্দের গৃহ প্রত্যাবর্তন। আর মেয়ে যখন বাড়ি ফেরে, তখন আতিথেয়তা ও বিশেষ খাবারের পারিবারিক আয়োজন থাকে।
শেফ অভিনন্দন কুণ্ডুর মতে, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের ধর্মীয় উৎসবের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজার রূপটি ধর্মীয় রীতির চেয়েও বেশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক। তিনি বলেন, আমরা দেবীকে কেবল ঈশ্বর হিসেবে দেখি না। ঠাকুমাদের দেখেছি তাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতে, তিনি এলে আনন্দ করা এবং বিদায়ের সময় চোখে জল ফেলা। এটি ভয় বা গোঁড়ামি থেকে নয়, বরং ভালোবাসা ও ভক্তি থেকে পাওয়া সম্মান।
অবশ্য সব হিন্দু বাঙালিই পূজায় আমিষ খান, এমন ধারণা ভুল উল্লেখ করে অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, অনেক বাঙালি ও পূজামণ্ডপ যেমন নিরামিষ নিয়ম পালন করেন, তেমনই বহু পরিবার ঐতিহ্যগতভাবেই এই উৎসবে মাছ ও মাংস খেয়ে আসছেন।
সূত্র: এনডিটিভি