ক্ষুধা লাগুক বা না লাগুক, অনলাইনে খাবারের অর্ডার দেওয়া যাবে। পছন্দের খাবার বেছে নিয়ে কার্টে যোগ করতে হবে, দাম বাড়তে দেখতে হবে, তারপর চেকআউট। এরপর জানানো হবে, ডেলিভারি রাইডার পথে আছে। কিন্তু খাবার কখনও আসবে না। কারণ পুরো অর্ডারটাই ভুয়া।
ভারতের দুই তরুণ সফটওয়্যার ডেভেলপার পুরবংশ পারমার ও অংশুল শর্মা তৈরি করেছেন ফুড নেভার কাম নামের এমন একটি ওয়েবসাইট। এখানে ২২ ধরনের খাবারের রান্নাঘর, ৩২৭টি পদ ও ৩১৯টি বাস্তব রেসিপি রয়েছে। সবকিছুর দামও নির্ধারিত, তবে খাবার সরবরাহের কোনও বাস্তব ব্যবস্থা নেই।
ওয়েবসাইটটির স্লোগান —খাবার কখনও আসে না, কিন্তু ডোপামিন আসে। জুনে চালু হওয়ার পর থেকে সাইটটিতে ২৭ লাখের বেশি মানুষ প্রবেশ করেছেন বলে দাবি নির্মাতাদের।
এটি এমন এক নতুন ইন্টারনেট প্রবণতার অংশ, যাকে বলা হচ্ছে ডোপামিন সাইট। এসব সাইটে কোনও পণ্য বা সেবা না কিনেও কেনাকাটা, খাবার অর্ডার কিংবা ভ্রমণের মতো অভিজ্ঞতার পুরো প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করা যায়। দক্ষিণ কোরিয়ায় শুরু হওয়া এই প্রবণতা এখন অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।
পুরবংশ ও অংশুলের নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই এই ধারণার জন্ম। তারা কম্পিউটার সায়েন্সের একটি ডিপ্লোমা কোর্সে পরিচিত হন। পরে নিউরোএক্স এআই নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। অনলাইনে পছন্দের পণ্য কার্টে যোগ করলেও শেষ পর্যন্ত না কেনার অভ্যাস তারা নিজেদের মধ্যেই লক্ষ্য করেছিলেন।
পুরবংশের খাবার অর্ডারের অভিজ্ঞতাও তাদের ভাবিয়েছে। মুম্বাইয়ে দুই মাসের একটি প্রকল্পে কাজ করার সময় তিনি সপ্তাহে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার রুপি খাবারের পেছনে খরচ করতেন। অনেক সময় প্রয়োজন না থাকলেও বেলজিয়ান ওয়াফল, আইসক্রিম কিংবা বড় এক জার টক ক্রিম অর্ডার করতেন। তার ধারণা, হয়তো সবসময় খাবারের জন্য আকাঙ্ক্ষা ছিল না, বরং অর্ডার করার প্রক্রিয়াটির প্রতিই আকর্ষণ ছিল।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী কেন্ট বেরিজ অবশ্য ডোপামিনকে সরাসরি আনন্দের রাসায়নিক হিসেবে দেখেন না। তার মতে, চাওয়া ও ভালো লাগা আলাদা বিষয়। ডোপামিন মূলত কোনও কিছুর প্রতি আকর্ষণ বা তা পাওয়ার তাগিদ বাড়ায়; জিনিসটি পাওয়ার পরের আনন্দের সঙ্গে তা এক নয়।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আসক্তিবিষয়ক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনা লেম্বকেও মনে করেন, পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত অভ্যাস ও আচারও সময়ের সঙ্গে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। তার মতে, কোনও পুরস্কার পাওয়ার আগের প্রত্যাশাও সেই পুরস্কারের মতোই আচরণকে উৎসাহিত করতে পারে।
তাহলে কাল্পনিক খাবার অর্ডার করে বাস্তব আকাঙ্ক্ষা মেটানো সম্ভব কি? বেরিজের মতে, এ ধরনের প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে আকর্ষণ ও আনন্দের অনুভূতি তৈরি করতে পারে। তবে নতুনত্ব দ্রুত কমে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
অংশুল নিজেও এর একটি অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। ফোনের স্ক্রিন ভেঙে যাওয়ার পর তিনি এক সপ্তাহ অ্যামাজনে বিভিন্ন ফোন তুলনা করে কার্টে যোগ করেছিলেন। পরে ফোনটি মেরামত করেই ব্যবহার করেন। তার ভাষায়, ফোন নিয়ে গবেষণা করা ও কার্টে যোগ করার প্রক্রিয়াটিই উপভোগ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত নতুন ফোন কেনেননি।
তরুণদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল পুরস্কারের প্রতি আকর্ষণ বেশি হতে পারে বলে মনে করেন লেম্বক। তার মতে, বিকাশমান মস্তিষ্ক তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কিশোর-কিশোরীরা নেতিবাচক পরিণতি পুরোপুরি বিবেচনা না করেই ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে জড়িয়ে পড়তে পারে।
নির্মাতারা বলছেন, আপাতত এসব সাইট থেকে অর্থ উপার্জনের পরিকল্পনা তাদের নেই। সাইটগুলো বিনামূল্যেই চালু রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সংগৃহীত তথ্য স্নায়ুবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
খাবার অর্ডার করার মজাকে কেন্দ্র করে তৈরি এই সাইটগুলো শেষ পর্যন্ত আধুনিক ভোগসংস্কৃতি নিয়ে বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে —কোনও কিছু পাওয়ার আগের উত্তেজনাই যদি এতটা আনন্দ দেয়, তাহলে সেই জিনিসটি আদৌ পাওয়ার প্রয়োজন কতটা?
সূত্র: বিবিসি