চীনের চতুর্থ বিমানবাহী রণতরি আগামী বছরই পানিতে নামানো হতে পারে। এটি দেশটির প্রথম পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। নিজ দেশের উপকূল ছাড়িয়ে আরও দূরে নৌ ও বিমানশক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়াতে রণতরির বহর গড়ে তুলছে বেইজিং। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।
২০২৭ সালে রণতরিটি পানিতে নামানো হলে তা চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) শতবর্ষ পূর্তির সঙ্গে মিলে যাবে। ১ আগস্ট পিএলএর প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পূর্ণ হবে। এর আগে সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিকীগুলোতে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার অগ্রগতি তুলে ধরেছে বেইজিং।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রকাশিত হালনাগাদ মূল্যায়নে ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) জানায়, চলতি মাসের স্যাটেলাইট চিত্রে জাহাজটির নির্মাণকাজের যে পর্যায় দেখা গেছে, তা ২০২১ সালের মে মাসে চীনের তৃতীয় বিমানবাহী রণতরি ফুজিয়ানের নির্মাণপর্যায়ের সঙ্গে তুলনীয়। ফুজিয়ান প্রায় এক বছর পর, ২০২২ সালের জুনে পানিতে নামানো হয়েছিল।
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, টাইপ ০০৪ নামে পরিচিত রণতরিটির আকার বড়, এর শক্তি উৎপাদনব্যবস্থা তুলনামূলক জটিল হতে পারে। এ ছাড়া নির্মাণে অপ্রত্যাশিত কোনও সমস্যা দেখা দিলে সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে। চীন সাধারণত সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণের সময়সূচি প্রকাশ করে না।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, উত্তর-পূর্ব চীনের ডালিয়ান শিপইয়ার্ডের একটি শুকনো ডকে রয়েছে রণতরিটির কাঠামো। তবে এতে এখনও উড়োজাহাজ ওঠানামার ডেক যুক্ত হয়নি। পানিতে নামানো মানেই কোনও বিমানবাহী রণতরি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাওয়া নয়। ফুজিয়ান পানিতে নামানোর তিন বছরেরও বেশি সময় পর, গত বছরের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশন পায়।
সিএসআইএসের চায়না পাওয়ার প্রকল্পের উপপরিচালক এবং মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সহলেখক ব্রায়ান হার্ট বলেন, ফুজিয়ানের নির্মাণ ও পানিতে নামানোর সময়সূচি অনুসরণ করা হলে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ কিংবা ২০২৮ সালের শুরুর দিকে টাইপ ০০৪ পানিতে নামানো হলে তিনি অবাক হবেন না।
সিএসআইএসের হিসাবে, অসমাপ্ত রণতরিটির কাঠামো প্রায় ৩২২ মিটার লম্বা এবং ৪৬ মিটার চওড়া। তবে চূড়ান্ত আকার এখনও স্পষ্ট নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষকের ধারণা, কাঠামোটি প্রায় ৩২৭ মিটার লম্বা। সম্পূর্ণ নির্মাণের পর এর দৈর্ঘ্য ৩৩৯ মিটার পর্যন্ত হতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরিগুলোর সমান।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন ও সাবেক ইউএস প্যাসিফিক ফ্লিটের গোয়েন্দাপ্রধান জিম ফ্যানেল এসসিএমপিকে বলেন, ডালিয়ান শিপইয়ার্ডে কাজের ব্যাপকতা ও গতি দেখে আগামী বছরই রণতরিটি পানিতে নামানোর বিষয়ে তার আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।
র্যা ন্ড করপোরেশনের জ্যেষ্ঠ নীতিগবেষক ব্র্যাডলি মার্টিনও মনে করেন, আগামী বছর রণতরিটি পানিতে নামানো সম্ভব। চীনের নৌবাহিনীর পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে পারমাণবিক শক্তিচালিত ব্যবস্থা যুক্ত করতে গিয়ে জটিলতা দেখা দিলে পানিতে নামানোর পর রণতরিটি কার্যক্রম শুরুর উপযোগী হতে দুই থেকে তিন বছর লেগে যেতে পারে।
টাইপ ০০৪-এ ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক উড়োজাহাজ উৎক্ষেপণব্যবস্থা ব্যবহারেরও প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের পেন্টাগন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ছয়টি বিমানবাহী রণতরি নির্মাণের লক্ষ্য রয়েছে চীনের। তা বাস্তবায়িত হলে দেশটির বহরে রণতরির সংখ্যা দাঁড়াতে পারে নয়টিতে।
ফ্যানেলের মতে, ডালিয়ানের সক্ষমতা দেখিয়েছে যে চীন দুটি শিপইয়ার্ডে বড় আকারের বিমানবাহী রণতরি নির্মাণ করতে পারে। তবে ২০৩৫ সালের মধ্যে ছয়টি রণতরি কার্যক্রমের উপযোগী করা তার কাছে বেশি বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে। হার্ট বলেন, ফুজিয়ান যেখানে নির্মিত হয়েছে, সেই জিয়াংনান শিপইয়ার্ড এবং ডালিয়ান- দুই জায়গায় একই সময়ে রণতরি নির্মাণের বিষয়টি অসম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল ওয়ার কলেজের জেমস আর হোমস সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে বলেন, চীনের নয়টি বিমানবাহী রণতরির বহর গড়ে তোলা সম্ভব। এমন বহর পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসহ এর বাইরেও সামরিক অভিযান পরিচালনার সুযোগ দেবে।
তবে মার্টিনের মতে, চীনের বিমানবাহী রণতরিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের রণতরির তুলনায় কমসংখ্যক উড়োজাহাজ মিশন পরিচালনা করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জলসীমায় এগুলো ঝুঁকির মুখেও পড়তে পারে। তারপরও বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতে নিজেদের অবস্থান ও বিকল্প বাড়াতে বেইজিংকে সহায়তা করবে এসব রণতরি।
সূত্র: উইয়ন নিউজ