প্রতিটি সন্ত্রাসী হামলায় মানুষ আতঙ্কিত হলেও সবসময়ই কিছু মানুষ অসাধারণ সাহস নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। নিস হামলায়ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লাফিয়ে ট্রাকে ওঠে হামলাকারীর সঙ্গে কুস্তি করে ট্রাক থামান এক ব্যক্তি। তিনিই পরিণত হয়েছেন শোকাহত ও ক্ষুব্ধ মানুষের নায়কে। তিনি যদি ট্রাক না থামাতেন তাহলে নিহত মানুষের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেত বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দৃশ্যটা একেবারে চলচ্চিত্রের মতোই। খলনায়ক যখন বেপরোয়া হামলা করে নায়ক তাকে বীরোচিতভাবেই থামান। এখানেও ঘটেছে তাই। ৩১ বছরের মোহামেদ লাহৌয়েজ বৌহেল যখন ভিড়ের মধ্য দিয়ে ২০ টন ওজনের ট্রাক চালিয়ে যাচ্ছিলেন তখন পেছনে ফেলে যাচ্ছিলেন নিহত মানুষের সারি। প্রায় ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা ট্রাক চালিয়ে একের পর এক মানুষকে হত্যা ও জখম করে যাচ্ছিলেন বৌহেল। পরিস্থিতি টের পেয়ে যখন মানুষ ছুটছিল নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে তখনই লাফিয়ে ট্রাকে ওঠেন এক ব্যক্তি। এরপর শুরু হয় ধস্তাধস্তি। এক পর্যায়ে হামলাকারীর হাত থেকে পিস্তল কেড়ে নেন ওই ব্যক্তি। হামলাকারী ধস্তাধস্তির সময় কয়েকটা গুলি ছুঁড়লেও তাতে কেউ আহত হননি। এরপরই পুলিশের দুই কর্মকর্তার গুলিতে নিহত হন ট্রাক চালক।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা এমনভাবেই ওই ব্যক্তির সাহসিকতার কথা বর্ণনা করেছেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা এরিক সিওট্টি জানান, মানুষ যখন ছুটছিল তখনই এক ব্যক্তি লাফিয়ে ট্রাকে ওঠেন। এরপর পুলিশ চালককে হত্যা করে। পুলিশ যখন হামলাকারীকে প্রায় ধরে ফেলছিল তার আগ মুহূর্তেই এটা ঘটে। আমি কখনোই ওই নারী পুলিশ কর্মকর্তার মুখ ভুলতে পারব না যিনি হামলাকারীকে নিষ্ক্রিয় করেছিলেন।
মিসরের নাগরিক নাদের এল শাফেই বিবিসিকে জানান, ট্রাক চালককে খুব ভয়ার্ত লাগছিল। আমি তার প্রতি চিৎকার করছিলাম। হাত নেড়ে ট্রাক থামাতে বলছিলাম। বুঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে তার ট্রাক চাপায় অনেক মানুষের ইতোমধ্যে মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু চালক ট্রাকের বাইরের কারও কথা শোনেননি।
শাফেই আরও বলেন, হঠাৎ দেখি চালক মোবাইল ফোনের মতো কিছু একটা বের করছেন। আমি মনে করেছিলাম, দুর্ঘটনার জন্য তিনি অ্যাম্বুলেন্স ডাকছেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আমার ভুল ভেঙে যায়। কারণ তখন চালক পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করেন।
মিসরীয় এ নাগরিক আরও বলেন, যখন পুলিশ ট্রাকের কাছাকাছি পৌঁছায় তারা বুঝতে পারে সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটছে। তারাও চিৎকার করে ট্রাক থামাতে বলেন। কিন্তু চালক না থেমে জানালা দিয়ে পিস্তল বের করতে শুরু করেন। পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্র চিনতে পেরে দেরি না করে গুলি করে।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (১৪ জুলাই) বাস্তিল দিবস উদযাপনের জন্য ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নাইসের প্রমেনাদে দেজ অ্যাংলেইসে আতশবাজি প্রদর্শনী দেখতে জড়ো হয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। সেখানে একটি ট্রাক ওই জমায়েতের দিকে ছুটে আসে। ফলাফল হিসেবে এ পর্যন্ত ৮৪ জন নিহত এবং বেশ ক'জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১৮ জনের অবস্থা ছিল বেশ আশঙ্কাজনক। সর্বশেষ দেশটির প্রেসিডেন্টে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, আহত ৫০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তারা জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। সূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট।
এ সম্পর্কিত আরও খবর-
- নিস হামলাকারী ট্রাকচালক নামাজ পড়তেন না, পেটাতেন স্ত্রীকেও
- রক্তে ভেজা নিসে রক্তের জন্যই হাহাকার
- ‘একটা ট্রাক অস্ত্রে রূপান্তরিত হয়ে বহু মানুষ হত্যা করলো’
- ফ্রান্সের ‘ট্রাক হামলাকারী’কে আগে থেকেই চিনত পুলিশ!
- ২০১০ সালেই ট্রাককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিল আল কায়েদা!
- হামলার পর ফ্রান্সে থমথমে নীরবতা, তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক
- দুইদিন আগেই ট্রাকটি ভাড়া করেন হামলাকারী
- ভিডিওতে দেখুন ফ্রান্সে ট্রাক হামলার পর উৎকণ্ঠিত মানুষের ছোটাছুটি
- ট্রাককে ‘সন্ত্রাসবাদী’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার এবারই প্রথম নয়
- শিশুদের বাঁচাতে নিরাপদে ছুড়ে দিচ্ছিলেন অভিভাবকরা
- ফরাসি মিডিয়ায় ‘আইএস-এর দায় স্বীকারের খবর’, বাড়ছে জরুরি অবস্থার মেয়াদ
- ফ্রান্স-তিউনিসিয়ার দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল 'হামলাকারী' ট্রাক চালকের!
/এএ/এমপি/