তুরস্কের এ ব্যর্থ অভ্যুত্থানের ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরা হলো সংক্ষেপে-
শুক্রবার সন্ধ্যা
সামরিক ক্যু প্রচেষ্টার খবর জানাজানি হওয়ার পরপরই তুরস্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার ও ইউটিউব বন্ধ করে দেওয়া হয়। ট্যাংকসহ সাঁজোয়া যান ইস্তানবুলের রাস্তায় নেমে আসে। প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দখল নেয় সামরিক বাহিনী। সামরিক যান দিয়ে শহরের সেতুগুলোর যাতায়াত বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, এক সেনা কর্মকর্তা রাস্তার লোকজনকে বলছেন, ‘দেশে অভুত্থান হয়েছে। আপনারা ঘরে ফিরে যান।’ এ সময় লোকজনকে দৌড়াতে দেখা যায়। শহরের রেস্তোরাঁ এবং অন্যান্য দোকানপাঠ বন্ধ হয়ে যায়।
তুর্কি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, দেশে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটতে চলেছে। মার্শল ল’ ঘোষণা করা হয়েছে। এর বিপরীতে সরকারপন্থী সেনা সদস্যরা জানায়, এখনও নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ক্ষমতাসীন রয়েছেন।
প্রেসিডেন্টের অফিসের এক মুখপাত্র জানান, সামরিক বাহিনীর একটি গ্রুপ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তারা শিগগিরই ব্যর্থ হবেন ও বিচারের সম্মুখীন হবেন।
শুক্রবার রাত
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যায়। আকাশে যুদ্ধবিমান উড়তে দেখা যায় এবং ট্যাংকগুলো রাস্তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। পার্লামেন্ট ভবনে ট্যাংক থেকে গোলা ছোড়া হয়। আঙ্কারা ও ইস্তানবুলে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।
তুর্কি টেলিভিশনে দেওয়া এক বিবৃতিতে সেনাবাহিনী জানায়, তারা দেশটির ক্ষমতা দখল করেছে। বিবৃতিটিতে এরদোয়ানের সমালোচনা করে বলা হয়, তিনি দেশটির সেক্যুলার ঐতিহ্যে আঘাত করেছেন। ওই বিদ্রোহী সেনারা দাবি করেন, এখন থেকে তুরস্ক শাসন করবে ‘শান্তি পরিষদ’।
এরদোয়ানের এক মুখপাত্র জানান, ওই ক্যু প্রচেষ্টায় সেনাবাহিনীর একাংশই কেবল জড়িত। আর এরদোয়ানই এখনও দেশটির ক্ষমতায় রয়েছেন।
ক্যু প্রচেষ্টার দুই ঘণ্টা পর এরদোয়ান ফেসটাইম অ্যাপস-এর মাধ্যমে টেলিভিশনে বিবৃতি দেন। সেখানে তিনি তার সমর্থক, যারা তাকে গত বছরের নভেম্বরে ৪৯.৫০ শতাংশ ভোট দিয়েছিলেন, তাদের কাছে আহ্বান জানান, তারা যেন রাস্তায় নেমে আসেন প্রতিরোধে। শহরের মোড়ে মোড়ে অবস্থান নেন ও বিমানবন্দরে জড়ো হন। তিনি বলেন, ‘জনগণের শক্তির চেয়ে বড় আর কিছুই নেই।’ বিচার বিভাগ এই হামলার পর যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এরদোয়ান নিরাপদে আছেন এবং মারমারিস থেকে কথা বলছেন। তিনি মারমারিসে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, মারমারিসে রাতভর হেলিকপ্টার এবং গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে এক সংবাদ সম্মেলনে এরদোয়ানও এর সত্যতা স্বীকার করেন।
সেনা সদস্যরা দেশটির কিছু কিছু অংশে কারফিউ জারি করেন। আতঙ্কিত তুর্কি নাগরিকদের খাদ্য ও পানি সংগ্রহ করতে এবং ব্যাংক থেকে অর্থ তুলতে দেখা গেছে।
মধ্যরাত
সামরিক বাহিনীর ক্যু প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বেসামরিক জনগণ জড়ো হতে থাকেন। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন হতাহতের খবর পাওয়া যায়।
এরদোয়ান অভিযোগ করেন, ওই বিদ্রোহী সেনারা যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ইসলামি চিন্তাবিদ ফেতুল্লাহ গুলেনের অনুসারী। গুলেন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ায় বসবাস করছেন। এক বিবৃতিতে তিনি এই ক্যু প্রচেষ্টার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এই ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নয় বলে দাবি করেছেন।
তুরস্কের বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সামরিক বাহিনীর প্রভাব যে অনেক কম, তা এই ক্যু প্রচেষ্টায় আবারও সামনে এসেছে।
শনিবার সকাল
এরদোয়ান ইস্তানবুলের আতাতুর্ক বিমানবন্দরে আসেন এবং ঘোষণা করেন, তিনিই সরকারের ক্ষমতায় থাকছেন। কর্নেল, জেনারেলের মতো জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাসহ প্রায় শতাধিক সেনাসদস্য গ্রেফতারের খবর আসার পরিপ্রেক্ষিতে এরদোয়ান জানান, তিনি এই সেনা বিদ্রোহের পেছনের মানুষদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেবেন।
এদিকে, আটক-গ্রেফতারের ভয়াবহতার পরও গোলাগুলির শব্দ ও বিভিন্ন ছবিতে এখনও বিদ্রোহীদের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আভাস পাওয়া গেছে। সরকারপন্থী সেনা সদস্যরাও জানিয়েছেন, কিছু কিছু জায়গায় বিদ্রোহীদের প্রতিরোধ রয়েছে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সেনা সদস্যদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এর মধ্যে ইস্তানবুলের বসফোরাস ব্রিজে বেশ কয়েকজন সেনা সদস্যকে আত্মসমর্পণ করতে দেখা যায়।
স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, অন্তত ৬০ জন নিহত হয়েছেন। যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক জনগণ। সামরিক পুলিশ দফতরে বিদ্রোহী সেনা সদস্যদের ১৬ জন নিহত হন এবং ২৫০ জন আটক হন। পৃথক ঘটনায় প্রেসিন্টের বাসভবনে বিশেষ বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের সংঘর্ষে ১৩ বিদ্রোহী সেনা নিহত হন।
সেনা প্রধান হুলুসি আকারকে মুক্ত করা হয়। তাকে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকালে বন্দি করা হয়েছিল। দেড় হাজারেরও বেশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যকে আটক করা হয়। এর মধ্যে রয়েছেন ২৯ জন কর্নেল এবং পাঁচ জেনারেল। তুর্কি সরকার জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন রিয়ার অ্যাডমিরাল নেজাত আতিলা দেমিরহান ও চিফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল মামদুহ হাকবিলেন।
শনিবার দুপুর
তুর্কি প্রধানমন্ত্রী রাতের ঘটনাকে তুরস্কের গণতন্ত্রের জন্য ‘কালো অধ্যায়’ বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি ক্যু প্রচেষ্টা ব্যর্থ করার জন্য বেসামরিক তুর্কি জনগণ এবং পুলিশের প্রশংসা করেছেন।
তিনি বলেন, ওই ‘অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায়’ ১৬১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১ হাজার ৪৪০ জন। অন্তত ২ হাজার ৮৩৯ জন সেনা সদস্যকে আটক করা হয়েছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।
/এসএ/এএ/