ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ ফ্রান্সিস বাংলাদেশ এসে পৌঁছেছেন। এর আগে তিনি প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে দুই দিন অবস্থান করেন। রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে কূটনৈতিক দেনদরবারের মধ্যেই পোপ এই দুটি দেশ সফর করছেন। স্বাভাবিকভাবে বিশ্বের যে কোনও দেশে পোপের সফর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর মানবাধিকারের পক্ষে সব সময় উচ্চকিত থাকা ফ্রান্সিস অন্য যে কোনও পোপের চেয়ে স্বতন্ত্র।
অন্য পোপের চেয়ে ফ্রান্সিস যে স্বতন্ত্র তার প্রমাণ তিনি মিয়ানমার সফর ও বাংলাদেশে এসে জানিয়ে দিয়েছেন। মিয়ানমারে দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, সংখ্যালঘু ক্যাথলিকদের সুরক্ষা আর রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন জোরদারের আশঙ্কা থেকেই পোপ ফ্রান্সিস পৃথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন ওই জনগোষ্ঠীর নাম উচ্চারণে সমর্থ হননি। তবে তিনি মিয়ানমার সরকারকে একেবারে ছেড়ে কথা বলেননি। রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণ না করেও তিনি তাদের কথা বলেছেন। বাংলাদেশেও রোহিঙ্গাদের নাম উচ্চারণ না করেই তিনি শরণার্থী সংকটে বাংলাদেশকে সহযোগিতায় বিশ্ববাসীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। পোপের সফর সূচি অনুসারে, তিনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করবেন ও তাদের কথা শুনবেন।
শুধু রোহিঙ্গা ইস্যুতেই নয়, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পোপ ফ্রান্সিস বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকট ও বিতর্ক থেকে শুরু করে জলবায়ু ইস্যুতে অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। রোমান ক্যাথলিক প্রধান হিসেবে যে ক্ষমতা রয়েছে তাতে যে কোনও পোপই বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ক্ষমতা যখন পোপ ফ্রান্সিসের হাতে তখন তা বিশ্বের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নতুন পোপ হিসেবে নির্বাচিত ও ফ্রান্সিস নামকরণের পর যখন সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে মানুষের মুখোমুখি হন তিনি তখন থেকেই রোমান ক্যাথলিক গির্জার চেতনা বাড়তে থাকে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম হাফিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একবিংশ শতাব্দির একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে এরইমধ্যে পরিণত হয়েছেন ফ্রান্সিস। শুরু থেকেই বিভিন্ন বিস্ময়কর ভাষণ দিয়ে সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছেন তিনি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বছরের মধ্যেই পোপ ইস্টারের আগের বৃহস্পতিবার (মন্ডি থার্সডে) পালন করেছেন তরুণ সহকর্মীদের এমনকি নারী ও মুসলমানদের পা ধুয়েছেন। তিনি বলেছেন, নাস্তিকতা কমিয়ে আনতে হবে, গির্জা সমকামী ও গর্ভপাতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, আমলাতন্ত্রকে আধ্যাত্মিক আলজেইমার রোগ বলে অভিযোগ করেছেন, উল্লেখ করেছেন আন্তর্জাতিক পূজিঁ বাজার দরিদ্রদের নিপীড়ন করছে। আর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন সমকামীদের বিষয়ে ‘আমি কে তাদের বিচার করা’র মন্তব্য করেন।
পোপের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ফ্রান্সিস অভিবাসী সংকট, গৃহহীন মানুষ, গরিব, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি, খ্রিস্টানদের ওপর নিপীড়ন এবং সর্বশেষ জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে সোচ্চার হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার সম্পর্কোন্নয়নে পোপ ফ্রান্সিসের কৃতিত্ব রয়েছে। ফ্রান্সিসের কিউবা সফরকে ১৯৭৯ সালে পোপ জন পল (দ্বিতীয়)-এর পোল্যান্ড সফরের মতোই ছিল। একটি কমিউনিস্ট দেশে কোনও পোপের প্রথম সফর ছিল তা।
কোনও পোপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে প্রথম ভাষণ দিয়েছেন ফ্রান্সিস। ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর রোহিঙ্গাদের ভাই ও বোন উল্লেখ করে তাদের জন্য প্রার্থনা করেন তিনি। মিয়ানমার সফরে সরাসরি রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণ না করেও তাদের কথা বলেছেন তিনি।
ভ্যাটিকানের ভেতরেও ফ্রান্সিস ব্যাপক সংস্কার এনেছেন। বিশেষ করে গির্জা ঘিরে যৌন নিপীড়নের কেলেঙ্কারির ঘটনায় ভাবমূর্তি যা ক্ষুণ্ন হয়েছিল তা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছেন তিনি। অনেকে সংস্কার প্রক্রিয়া ধীর গতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ভ্যাটিকান সঠিক কাঠামো ও সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়া শুরু করেছে বলে মনে করেন। বিশেষ করে ভ্যাটিকান ব্যাংক ঠিক পথেই এগুচ্ছে বলে তাদের ধারণা।
ধারণা করা হয়, বর্তমান বিশ্বের জলবায়ু, অর্থনীতি ও অভিবাসন ইস্যুতে পোপ ফ্রান্সিসের চেয়ে সরাসরি কেউ কথা বলেননি। এক সময় পোপের টুইটার অ্যাকাউন্ট নিয়ে ব্যঙ্গ করা হলেও গত কয়েক বছর ধরে পোপ ফ্রান্সিস টুইটারের সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছেন।
মুখোমুখি বৈঠকে কিংবা লাখো মানুষের উপস্থিতিতে পোপ ক্যাথলিক ও অ-ক্যাথলিকদের সঙ্গে একই ধরনের আচরণ করেন। ধর্ম ও অধর্ম যেখানে এক হয়ে স্বার্থপরতার পিছে ছুটছে, বৈষম্য তৈরিতে মানুষ উন্মুখ; সেখানে আরও মানবিক, শান্তিপূর্ণ হতে মানুষ যখন অনুপ্রেরণা খুঁজছে তখন পোপ ফ্রান্সিসের ভাষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।