ইউক্রেনে কেন যুক্তরাষ্ট্রের কোনও রাষ্ট্রদূত নেই?

ইউক্রেনে রুশ হামলার হুমকির মধ্যেই নতুন একটি প্রশ্ন সামনে উঠে এসেছে। প্রশ্নটি হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেনের দায়িত্বভার গ্রহণের এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও কেন তিনি কিয়েভে একজন রাষ্ট্রদূত নিয়োগে ব্যর্থ হয়েছেন?

বাইডেন প্রশাসন বা ইউক্রেন সরকার কারও তরফেই এমন বিলম্বের স্পষ্ট ব্যাখ্যা মিলছে না। ঝানু কূটনীতিকরা বলছেন, সাধারণ সময়েও এমন ঘটনা বিস্ময়কর ও অমার্জনীয় বলে প্রতীয়মান হবে।

রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশকে বাঁচাতে ওয়াশিংটনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ইউক্রেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশটিতে একজন পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতি বাইডেন প্রশাসন এবং জেলেনস্কি সরকারের মধ্যে উদ্ভূত শীতল সম্পর্ককে স্বাভাবিক করতে পারে। তবে এটাও স্পষ্ট নয় যে ইউক্রেনীয়রা বাইডেনের কাছ থেকে একজন দূত গ্রহণের জন্য কতটা আগ্রহী। কয়েক সপ্তাহ আগেই অনুমোদনের জন্য কিয়েভে একজন সম্ভাব্য রাষ্ট্রদূতের নাম জমা দিয়েছেন বাইডেন।

২০১৯ সাল থেকে ইউক্রেনে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পদটি খালি রয়েছে। ওই সময়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিয়েভে শেষ পূর্ণাঙ্গ মার্কিন দূত মেরি এল. ইয়োভানোভিচকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। ওই পদক্ষেপ পরে যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল তদন্ত পর্যন্ত গড়ায়। অভিশংসন সংক্রান্ত তদন্তের মুখে পড়েন ট্রাম্প।

পরে এ সংক্রান্ত তদন্তকারী প্যানেল জানায়, ২০২০ সালের নির্বাচনে পুনরায় বিজয়ী হওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ইউক্রেনের কাছ থেকে বিদেশি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন'। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ধ্বংস করে দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট পদে পুনর্নির্বাচনের প্রচারণায় সহায়ক হতো, এমন দুটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্তের স্বার্থে তিনি জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষতি করেছেন। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, জেলেনস্কি ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের ব্যাপারে তদন্ত শুরুর ঘোষণা দেবেন। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পালাবদলে হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের স্থলাভিষিক্ত হন সেই জো বাইডেন।

স্লোভাকিয়ায় নিযুক্ত বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রিজেট ব্রিঙ্ককে ইউক্রেনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিতে চান বাইডেন। দুই মাস আগে প্রকাশিত এমন প্রতিবেদনের বিরোধিতা করছেন না মার্কিন কর্মকর্তারাও। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র গত মাসে প্রথাগত পর্যালোচনা ও অনুমোদনের জন্য ইউক্রেন সরকারের কাছে ব্রিজেট ব্রিঙ্কের নাম পাঠায়।

কূটনৈতিক রীতি অনুযায়ী কিয়েভের ছাড়পত্র পাওয়ার পরই বিষয়টি সিনেটে পাঠাতে পারবে বাইডেন প্রশাসন। গত ১৯ জানুয়ারি ইউক্রেন সফরকালে শিগগিরই দেশটিতে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের আশাবাদের কথা জানান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন।

ইউক্রেন সরকার কেন দেশটিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে ব্রিজেট ব্রিঙ্ককে অনুমোদন দেননি সেটি স্পষ্ট নয়। একজন সম্ভাব্য রাষ্ট্রদূতকে যাচাই করার জন্য কয়েক সপ্তাহ সময় ব্যয় করা খুব অস্বাভাবিক কোনও ঘটনা নয়। তবে সচরাচর এ ধরনের অনুমোদনে সাধারণত খুব বেশি সময় লাগে না।

কূটনীতিকরা বলছেন, তাদের ধারণা ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও উচ্চ পর্যায়ের কাউকে চাইবে।

এ ব্যাপারে ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে নিযুক্ত ইউক্রেনীয় দূতাবাসের কাছ থেকে মন্তব্য চেয়েছিল সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। তবে তাদের তরফে কোনও সাড়া মেলেনি। গত সপ্তাহে ইউক্রেনের একটি টেলিভিশন চ্যানেল জানিয়েছে, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেবা নিশ্চিত করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রে তরফে রাষ্ট্রদূত হিসেবে যার নাম দেওয়া হয়েছে তার প্রার্থিতা বিবেচনা করছে সরকার।

রাশিয়া যদি ইউক্রেনের ওপর পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ শুরু করে সেক্ষেত্রে অবশ্যই এটা সম্ভব যে মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের দেশটি থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। বর্তমানে ইউক্রেনে মার্কিন দূতাবাসের অন্তর্বর্তীকালীন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের দায়িত্ব পালন করছেন ক্রিস্টিনা কেভিয়েন। পররাষ্ট্র বিষয়ক কাজে অত্যন্ত অভিজ্ঞ এই কূটনীতিককে ইউক্রেনে অত্যন্ত সম্মান করা হয়। কিন্তু আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, তার হোয়াইট হাউজ কর্তৃক নিযুক্ত এবং সিনেট কর্তৃক অনুমোদিত রাষ্ট্রদূতের স্ট্যাটাস নেই।

ক্লিনটন প্রশাসনের সময় কিয়েভে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন স্টিভেন পিফার। কূটনীতিক হিসেবে ক্রিস্টিনা কেভিয়েনের কর্মদক্ষতার প্রশংসা করেন তিনি। তবে তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনীয়রা ভাবছেন, কেন এখানে কোনও মার্কিন রাষ্ট্রদূত নেই?’

মার্কিন কূটনীতিকদের প্রতিনিধিত্বকারী ইউনিয়ন এবং পেশাদার গ্রুপ আমেরিকান ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এরিক রুবিন। তিনি বলেন, একজন রাষ্ট্রদূত দুই রাজধানীকে তাদের মতামত এবং জনসাধারণের বার্তাগুলোর সমন্বয় করতে সাহায্য করে থাকেন।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা বারবার যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার মূল বিষয়গুলো থেকে সরে এসেছেন বা বিরোধিতা করেছেন। আতঙ্ক এড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার আসন্ন হামলা পরিকল্পনার জোরালো তথ্য চেয়েছেন। বলেছেন, এসব আতঙ্কের ফলে তার দেশ ও দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

১৯৯০-এর দশকে কিয়েভে মার্কিন দূতাবাসে কর্মরত এরিক রুবিন বলেন, সাধারণভাবে কোনও দেশে রাষ্ট্রদূত না পাঠানোকে একটি সংকেত হিসেবে নেওয়া যেতে পারে যে, আমরা গুরুত্ব দেই না।

বাইডেন প্রশাসন এখনও পর্যন্ত দুই ডজনেরও বেশি দেশে রাষ্ট্রদূত মনোনয়ন দিয়েছে। তবে ইউক্রেনে দূত মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নিতে তার দীর্ঘ সময় নেওয়াকে রহস্যজনক বলছেন কোনও কোনও কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা অবশ্য এমন বিলম্বের কারণ নিয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি।

কিছু কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হোয়াইট হাউসের প্রস্তাবিত রাষ্ট্রদূত প্রার্থীর সিনেট শুনানিতে নর্ড স্ট্রিম ২ প্রকল্প নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হতে পারে। বহুল আলোচিত এই পাইপলাইন প্রকল্পের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে জার্মানিতে গ্যাস সরবরাহের কথা রয়েছে। তবে ১১শ’ কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই পাইপলাইনটির কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি। এই পাইপলাইন নিয়ে আরও বিরোধিতা না করার জন্য পার্লামেন্টের উভয় পক্ষের সদস্যরাই জো বাইডেনের সমালোচনা করেছেন।

রিপাবলিকানদের পক্ষ থেকে জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেনের ইউক্রেনে অতীতের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের বিষয়টিও শুনানিতে জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারে। তবে সিনেটে রিপাবলিকান পার্টির একজন সদস্য জানিয়েছেন, দলের তরফে এমনটা করার কোনও পরিকল্পনার বিষয়ে তার জানা নেই।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফরেন সার্ভিস অফিসার হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে ব্রিজেট ব্রিঙ্কের। সাবেক দুইটি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র উজবেকিস্তান ও জর্জিয়াতেও কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে তার ব্যাপারে ইউক্রেনের অনাগ্রহের কারণটিও স্পষ্ট নয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারাও মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের তাদের প্রতি তিরস্কারকারীদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বিবেচনা করতেন, যারা ক্রমাগত বিবৃতি দিয়ে অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড এবং সুশাসনের অভাব নিয়ে কথা বলতেন। তার ওপর ট্রাম্প আমলে ইউক্রেনে বাইডেনের ছেলের ব্যবসা নিয়ে তদন্ত করতে কিয়েভের ওপর চাপ দেওয়া হয়। সে ঘটনা পরে বহু দূর গড়ায়।

সবকিছুর পরও ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার হামলা ঠেকাতে মস্কোর সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ কূটনীতি পরিচালনা করছে বাইডেন প্রশাসন। সেই মস্কোতেও নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেননি বাইডেন। বরং ট্রাম্প আমলে নিযুক্ত জন সুলিভানকে অনির্দিষ্টকালের জন্য দায়িত্ব পালনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।