রাশিয়ার সামরিক বাহিনী অপেক্ষাকৃত দুর্বল। ইউক্রেনে আগ্রাসন চালাতে গিয়ে উল্টো এমন বার্তাই যেন দিয়ে ফেলেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। অথচ এই রাশিয়াকেই দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো। স্বভাবতই ইউক্রেনের এ ঘটনা ক্রেমলিন সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে।
ইউক্রেনে মাত্র এক দিনের লড়াইয়ের পর রাশিয়ার সেনাবাহিনী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার প্রাথমিক গতিবেগ হারিয়ে ফেলে। দেখা দেয় জ্বালানি, গোলাবারুদ এবং এমনকি খাদ্যের ঘাটতি। স্পষ্ট হয়ে উঠে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রশিক্ষণ আর নেতৃত্বের বিষয়টিও। সেনাবাহিনীর দুর্বলতা ঢাকতে দূরপাল্লার বিমান আর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পথ বেছে নেয় মস্কো। এমনকি শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক হুমকির আশ্রয় নেন পুতিন। রাশিয়ার পারমাণবিক প্রতিরোধ বাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দেন তিনি। মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মস্কোর নিয়মিত বাহিনী ইউক্রেনের মাটিতে দ্রুত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
বিস্মিত সামরিক পর্যবেক্ষকরা
পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে ইউক্রেনে ঢুকে পড়া রুশ বাহিনী তাদের পার্শ্ববর্তী একটি দেশে মাত্র কয়েক মাইল পর্যন্ত অগ্রসর হতে সক্ষম হয়েছে। এ ঘটনা সামরিক পর্যবেক্ষকদের রীতিমতো বিস্মিত করেছে।
অবসরপ্রাপ্ত একজন ইউএস আর্মি জেনারেল নিউজউইককে বলেন, ‘আমরা জানি যে রাশিয়ার একটি তৎপর সেনাবাহিনী রয়েছে এবং তাদের সরঞ্জাম সবসময়ই ভোঁতা। কিন্তু আপনার যদি ন্যূনতম কোনও অর্জনের সম্ভাবনা না থাকে তবে কেন আপনি পুরো দুনিয়ার সমালোচনার মুখে পড়ার ঝুঁকি নেবেন?’
মার্কিন বাহিনীর সাবেক এই জেনারেলের মতে, এর একমাত্র ব্যাখ্যা হলো রুশ প্রেসিডেন্টের দফতর ক্রেমলিন তাদের নিজস্ব বাহিনীকে অতিমাত্রায় মূল্যায়ন করেছে।
সিআইএ-র সাবেক একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিউজউইককে বলেন, ‘আমি চিন্তা করি, রাশিয়ান সামরিক পর্যালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে মার্শাল ঝুকভ (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সোভিয়েত সমরনায়ক) কিভাবে পূর্ব ইউরোপ পেরিয়ে বার্লিনের দিকে যাত্রা করেছিলেন।’ ঝুকভের নির্দেশ ছিল, কামানগুলো সারিবদ্ধ করুন। আপনার সামনে সবকিছু সমতলভাবে রাখুন। তারপর জীবিত থাকা কাউকে খুন বা ধর্ষণ করতে সাধারণ সেনা পাঠান।’
স্বল্পমেয়াদে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক ব্যর্থতা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কাসহ ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার হুমকি বাড়িয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যদি অবস্থা খারাপের দিকে না যায় এবং সংঘাত দমনে মস্কো সফল হয় সেক্ষেত্রে ভিন্ন আলোচনার অবকাশ আছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে রাশিয়ান প্রচলিত সামরিক দুর্বলতার বিষয়গুলো যে ভূরাজনৈতিক কৌশলবিদরা তুলে ধরেন, এমনকি মার্কিন সরকারের অভ্যন্তরে থাকা ব্যক্তিরাও রাশিয়াকে সামরিক হুমকি হিসেবে ধরে নেবেন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের স্মৃতি
ইউক্রেনে চালানো আগ্রাসনে রাশিয়ার হোঁচট খাওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কথা মনে করিয়ে দেয়। যখন চোখ খুললেই এটি স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, সম্ভাব্য একটি অপ্রতিরোধ্য সামরিক বাহিনী আদতে একটি বিধ্বস্ত অর্থনীতি এবং একটি দুর্বল রাজনৈতিক ও মানবিক ভিত্তিকে ঢেকে রেখেছিল। মনে হচ্ছে, তিন দশক পর কিছু পাঠ শেখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল নিউজউইকে লিখেছেন, ‘কোনও স্বৈরশাসক বা কর্তৃত্ববাদী যারা ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চায় তারা কখনও অধস্তন সামরিক নেতাদের মধ্যে খুব বেশি দক্ষতা তৈরি করতে চায় না।’ সেটা সাদ্দাম হোসেন বা ভ্লাদিমির পুতিন; যেই হোক না কেন!
সাবেক এই কর্মকর্তার মতে, সামরিক অধীনস্থদের অত্যধিক দক্ষতা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়।
মার্কিন সামরিক বিশ্লেষক এবং বিশেষজ্ঞরা গত সপ্তাহে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন প্রত্যক্ষকালে বেশ কিছু শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় ভোর ৪টার দিকে ইউক্রেনে আগ্রাসন চালায় রাশিয়া। দেশটির রাজধানী কিয়েভে হামলা চালানো হয় মাত্র ৭০ মাইল দূরের বেলারুশ থেকে। উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব দিক থেকে হামলা চালানো হয়েছে রাশিয়ার ভূখণ্ড থেকে।
ইউক্রেনের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর কিয়েভের দিকে অগ্রসর হতে থাকে রুশ বাহিনীর সদস্যরা। এখনও শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি রুশ বাহিনী। ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভ। রুশ সীমান্ত থেকে এর দূরত্ব ২০ মাইলেরও কম। যুদ্ধের ষষ্ঠ দিন মঙ্গলবার সকালে শহরটির কেন্দ্রস্থল ফ্রিডম চত্বরে অবস্থিত সরকারি কার্যালয় লক্ষ্য করে হামলা চালায় রুশ বাহিনী। ইউক্রেনের দাবি, শহরটি এখনও পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তৃতীয় আক্রমণটি চালানো হয় রুশ অধিকৃত ক্রিমিয়া এবং দক্ষিণে কৃষ্ণ সাগর থেকে ইউক্রেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর ওডেসায়।
পূর্বের চতুর্থ অক্ষটি লুহানস্কের মধ্য দিয়ে পশ্চিম দিকে ঠেলে দেয় এবং রুশ-অধ্যুষিত ডনবাস থেকে আক্রমণ করে।
একযোগে হামলা
স্থল হামলার সময় একযোগে ১৬০টি রাশিয়ান ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ, স্থল এবং সমুদ্র থেকে লক্ষ্যবস্তুতে হানে। প্রায় ৮০টি রাশিয়ান বোমারু বিমান এবং ফাইটার প্লেন এই হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৪০০টি হামলা চালানো হয়। টার্গেট করা হয়, ১৫টি কমান্ড কন্ট্রোল নড এবং সামরিক সদর দফতর, ১৮টি বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপনা, ১১টি বিমান ঘাঁটি এবং ছয়টি সামরিক ঘাঁটি।
এটি একটি অপ্রতিরোধ্য আক্রমণ ছিল না। তবে বেশিরভাগ পশ্চিমা বিশ্লেষক ধরে নিয়েছিলেন যে, রাশিয়ার কেবল তার স্থল বাহিনীর জন্য রাজধানী দখল এবং সরকারকে পতনের পথ প্রশস্ত করা দরকার। প্রথম দিনের আক্রমণে রাশিয়ান বিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর একটি ছোট অংশকে নিযুক্ত করা হয়েছিল।
নিজেদের স্বল্প পাল্লার কামান এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ওপর ভর করে বৃহস্পতিবার দিনশেষে ইউক্রেনের ভূখণ্ডে জায়গা করে নিতে সমর্থ হয় রাশিয়ার স্থল বাহিনী। ইউনিফর্ম এবং বেসামরিক পোশাকে রাশিয়ান বিশেষ বাহিনী এবং নাশকতাকারীদের দেখা যায় কিয়েভের কেন্দ্রস্থলে। কিন্তু পরে সেখানে রুশ বাহিনীর দুর্বলতা প্রকটভাবে ধরা পড়ে।
ইউক্রেনীয়দের প্রতিরোধ
সম্ভবত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল হোস্টোমেলের যুদ্ধ। কিয়েভের উত্তরে এয়ারফিল্ড এবং ইউক্রেনের গণতান্ত্রিক সরকারকে দ্রুত উৎখাতের জন্য এটি রাশিয়ার প্রচেষ্টার মূল চাবিকাঠি। বৃহস্পতিবার ভোরে হেলিকপ্টার নিয়ে সেখানকার বিমানবন্দরে অবতরণ করে রাশিয়ার বিমান সেনারা। কিন্তু দিনের শেষে ইউক্রেনীয়রা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেয়।
এদিকে কিয়েভের ২০ মাইল উত্তরে রাশিয়ান সেনাদের প্রধান বাহিনীর অগ্রবর্তী দলটি দমে যায়। বেলারুশ সীমান্ত থেকে ডিনিপার নদীর পশ্চিম তীর ধরে দক্ষিণে যাওয়ার সময়, ট্যাঙ্ক এবং সাঁজোয়া যানগুলোর অগ্রযাত্রার গতি কমে যায়। দখলদার বাহিনীর অগ্রসর ইউনিটের ওপর হামলা চালিয়ে অপ্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করে ইউক্রেনীয় বাহিনী। বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে রুশ বাহিনী। অন্যদিকে উজ্জীবিত হয় ইউক্রেনীয় সেনারা এবং দেশটির জনগণ। এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, বয়স্ক নারীরাও সেদিন ঝাড়ু হাতে রাস্তায় নেমে এসেছিল।
দূরপাল্লার হামলা বাদে রাশিয়ান আক্রমণের প্রাথমিক প্রচেষ্টার প্রায় সবকিছুই ব্যর্থ হয়েছে। ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করতে পারেনি মস্কো। দেশটির বিমান ঘাঁটিগুলোকেও অকার্যকর করে দেওয়া সম্ভব হয়নি। ইউক্রেনীয় বাহিনী তাদের ভূখণ্ড ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। দেশটির বেশ খানিকটা ভেতরে চলে যাওয়া রাশিয়ান বিশেষ বাহিনীকে স্থলভাগের মূল রুশ বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। বিশেষত গোলাবারুদ পুনরায় সরবরাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় ওই সেনাদের।
তাৎপর্যপূর্ণভাবে রাশিয়া সামরিক অভিযানের সঙ্গে আধুনিক কোনও প্রযুক্তি সেভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। সাইবার স্পেস, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ইন্টারনেটসহ টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো মোটাদাগে স্বাভাবিক রয়েছে। এসব সেক্টরে বড় ধরনের কোনও ধাক্কা দিতে সমর্থ হয়নি রুশ বাহিনী।
মার্কিন গোয়েন্দা সূত্র নিউজউইককে জানিয়েছে, রাশিয়ান স্থল বাহিনী আশ্চর্যজনকভাবে ধীরগতির এবং সমন্বয়হীন ছিল। এতে করে ক্রেমলিনের কৌশল ও উদ্দেশ্য গুরুতরভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
নিউজউইক বলছে, রাশিয়ার দুর্বলতার এমন প্রদর্শন ইউরোপের প্রতি মস্কোর সামরিক হুমকির বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের জন্য স্বস্তিদায়ক হওয়া উচিত। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভিন্ন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, যেখানে রাশিয়াকে সামরিক দিক থেকে সমতুল্য হিসেবে মনে করা হবে না। নিউজউইক অবলম্বনে।