ইউক্রেন যুদ্ধে যেভাবে উন্মোচিত হচ্ছে পশ্চিমা মিডিয়ার পক্ষপাত

হুট করে পেট্রোল বোমা বানানো হয়ে গেলো আকর্ষণীয় – অন্তত সংবাদমাধ্যম যদি আপনাকে বিবেচনা করে শ্বেতাঙ্গ, ইউরোপীয় ও ‘সভ্য’। এটি আবার অন্যদের অবাক করতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মতো স্থানে আরও বেশি প্রতিষ্ঠিত প্রতিরোধ আন্দোলন যেখানে চলছে। এমন কিছুর জন্য এসব অঞ্চলের মানুষদের নিরবচ্ছিন্নভাবে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দেওয়া হয়।

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে কথাগুলো লিখেছেন জোনাথন কুক। সাংবাদিকতায় মার্থা গেলহর্ন বিশেষ পুরস্কারজয়ী এই সাংবাদিক ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত নিয়ে তিনটি বই লিখেছেন। যুদ্ধের খবর প্রকাশে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের পক্ষপাতিত্বের বিষয়টি তুলে ধরতে গিয়ে তিনি এই কথাগুলো বলেছেন।

শুধু কুক নন। ইউক্রেনে রুশ হামলা শুরুর এক সপ্তাহ অতিবাহিত হওয়ার পর পশ্চিমা মিডিয়াতে তা যেভাবে তুলে ধরা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য বা অন্য দেশের সংঘাতের তুলনায়, সেটি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন, ইউরোপ বা শ্বেতাঙ্গদের প্রতি পশ্চিমা মিডিয়ার পক্ষপাতিত্বের কথা আবার কেউ বলছেন দ্বিচারিতার কথা।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম এমএসএনবিসিতে প্রকাশিত অপর এক প্রবন্ধে আয়মান মহেলডিন লিখেছেন, বৈদেশিক প্রতিনিধি হিসেবে আমি লেবানন, মিসর ও তুরস্কে শরণার্থীদের ঢলের খবর সংগ্রহ করেছি। ইরাক ও লিবিয়ার যুদ্ধের প্রভাব সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেছি। এসব সংঘাতে পশ্চিমারা সরাসরি জড়িত। ওই ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের প্রতিক্রিয়া ছিল নিস্তেজ। মোটাদাগে বিশ্ব ওই শরণার্থীদের প্রতি করুণার চোখে তাকিয়েছে। কিন্তু দায়িত্ববোধ, সহানুভূতিও প্রচণ্ড ধাক্কা খায়নি। যেমনটি আমরা এখন ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান শুরুর পর খবরে দেখতে পাচ্ছি।

তিনি আরও লিখেছেন, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিশ্ব ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার ভয়াবহতা দেখছে। ভাইরাল ভিডিওতে সরকারের দেওয়া অ্যাসল্ট রাইফেল হাতে তরুণ ও বয়স্কদের জ্বলজ্বলে গোলিয়াথ রাশিয়ার বিরুদ্ধে ডেভিড ইউক্রেন লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত বলে দেখা যাচ্ছে। পেট্রোল বোমা থেকে শুরু করে আগুন বোমা বানানোর নারীদের ভিডিও হয়েছে ভাইরাল। রুশ সেনারা যখন তাদের দেশকে আক্রমণ করতে আসছে তখন এমন ঘটনাগুলোকে বীরত্বের নির্ভীক অভিব্যক্তি, সম্পদ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে বিদেশি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ন্যায্য প্রতিরোধে মানুষের দৃঢ়তার প্রশংসা করা হচ্ছে।

আয়মান মহেলডিন লিখেছেন, ইউক্রেনীয়রা পশ্চিমা মিডিয়া ও সরকারের এমন সমর্থন পেলেও ইরাকিদের ক্ষেত্রে সেটা ঘটেনি। যারা তাদের দেশে মার্কিন দখলদারিত্বের বিরোধিতা করছিলেন। কিংবা ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সশস্ত্র প্রতিরোধকে তাদের স্বাধীনতার লড়াই হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়নি। নিজ মাতৃভূমির জন্য অস্ত্র ধরায় তাদেরকে সন্ত্রাসী বলা হয়েছে।

তিনি স্পষ্ট করছেন, ‘এর অর্থ এই নয় যে চলমান রুশ আগ্রাসন মোকাবিলা করা ইউক্রেন বিশ্বের কাছ থেকে সরঞ্জাম, কাভারেজ বা প্রশংসা পাওয়ার অধিকার রাখে না। কিন্তু এটি মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি শিক্ষণীয় মুহূর্ত হিসেবে হাজির হয়েছে – কীভাবে আমরা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংঘাত তুলে ধরি।

পশ্চিমা মিডিয়ার দ্বিচারিতা তুলে ধরতে জোনাথন কুক ইউক্রেনীয় শহরে রাশিয়ার অবরোধ এবং ফিলিস্তিনের গাজা প্রসঙ্গ তুলে এনেছেন। তিনি লিখেছেন, গত ১৫ বছর ধরে ইসরায়েলের বাণিজ্যিক অবরোধের শিকার গাজা। নারী, শিশু ও হুইলচেয়ারে থাকা মানুষেরা প্রায়ই ইসরায়েলি বাহিনীকে লক্ষ্য করে দূর থেকে পাথর নিক্ষেপ করে, নিজেদের স্বাধীনতা দাবিতে এটি প্রতীকী প্রতিবাদ। এমন বিক্ষোভের জন্য ইসরায়েলি বাহিনী প্রায়ই তাদের গুলি করে। পশ্চিমা মিডিয়া মাঝে মধ্যে ইসরায়েলি স্নাইপারদের গুলিতে অঙ্গ বা প্রাণ হারানো মানুষদের কথা প্রকাশ করে। কিন্তু ইউক্রেনের মতো কখনও তাদের কর্মকাণ্ডকে প্রতিরোধ বলে না। বেশিরভাগ সময় এই বিক্ষোভকারীদের হামাসের প্ররোচনাকারী হিসেবে তুলে ধরা হয়। ইউক্রেনের মতো গাজার কোনও সেনাবাহিনী নেই, যুদ্ধবিমান নেই এবং ইউক্রেনের মতো পশ্চিমারা তাদের অস্ত্র দিচ্ছে না।

তিনি আরও লিখেছেন, এই দ্বিচারিতা সর্বত্রই। এটা ভাবা অসম্ভব যে, ইউক্রেন ছাড়া অন্যত্র খবর সংগ্রহের সময় রিপোর্টিং কনভেনশনের কথা ভুলে যাচ্ছেন সাংবাদিকরা। এই সাংবাদিকরা যুদ্ধের খবর সংগ্রহের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। অনেকেই গাজা, বাগদাদ, নাবলুস, আলেপ্পো ও ত্রিপোলিতেও কাজ করেছেন।

আয়মান মহেলডিনের কথায়, সংকটে থাকা মানুষদের আমরা কীভাবে দেখবো তা শুরু হয় খবর সরবরাহ করা সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে। মিডিয়ার সদস্যদের উচিত যুদ্ধের শিকার অন্য দেশ ও মানুষদের নিচু হিসেবে না দেখা। আমাদের নিজেদের পক্ষপাতিত্ব শনাক্ত করা প্রয়োজন যাতে করে আমরা আরও বেশি সহিষ্ণু হই। অন্যদের গায়ের রঙ নয়, তাদের দুর্ভোগের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যেন তাদের গ্রহণ করতে শুরু করি।

জোনাথন কুক বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের রাশিয়ার খবর জানা উচিত যাতে করে পুতিন কী ভাবছেন ও চান তা আমরা বুজতে পারি। পুতিন কী ভাবছেন তা সম্পর্কে বিবিসি’র প্রধান আন্তর্জাতিক প্রতিনিধির ভাবনা জানার আমাদের প্রয়োজন নেই। পশ্চিমা ও রাশিয়ার ফেক নিউজ দ্রুত চ্যালেঞ্জ করার মতো তথ্যসূত্র আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হলো আমাদের বর্ণবাদী বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। যে দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা সব সময় ভালো মানুষ, অন্যরা সব সময় খারাপ এবং অন্যদের নয়, আমাদের দুর্ভোগ গুরুত্বপূর্ণ।