ইউক্রেন যুদ্ধ: আইসিসি কী পুতিনের বিচার করতে পারবে?

হেগভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এর প্রসিকিউটর ঘোষণা দিয়েছেন, ইউক্রেনে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়ে একটি তদন্ত শুরু হয়েছে। এই ঘোষণার পর কয়েকটি বিষয় হাজিয়ে হয়েছে- রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বা রাশিয়ার সামরিক কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের কীভাবে বিচারের আওতায় আনা হবে এবং এক্ষেত্রে কী কী বাধা রয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এসব প্রশ্নের জবাব তুলে ধরা হয়েছে।

যেসব অপরাধের বিচার করে আইসিসি

আইসিসি চার ধরনের অপরাধের বিচার করে: যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা এবং আগ্রাসন। আইসিসির চিফ প্রসিকিউটর করিম খান বলেছেন, ইউক্রেনে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে মনে করার যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে।

যুদ্ধাপরাধের আওতায় রয়েছে ইচ্ছাকৃত হত্যা, সচেতনভাবে বড় ধরনের দুর্ভোগ তৈরি, তীব্র ধ্বংসযজ্ঞ, সম্পত্তি গ্রাস। আরও রয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক জনগোষ্ঠী বা বস্তুকে নিশানা করা। মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় রয়েছে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক বা পরিকল্পিত হামলাজনিত হত্যাযজ্ঞ।

রাশিয়া বা ইউক্রেন আইসিসি'র স্বাক্ষরকারী না হওয়াতে কী জটিলতা আছে?

করিম খান জানান, আইসিসি প্রতিষ্ঠার রোম ঘোষণায় স্বাক্ষর করেনি ইউক্রেন। দেশটি নিজেই অপরাধের অভিযোগ করতে পারে না। কিন্তু এর আগে দুই বার ইউক্রেন আদালতটির এখতিয়ার মেনে নিয়েছে। এর মধ্যে ছিল ২০১৪ সালে রাশিয়া যখন ক্রিমিয়াকে বিচ্ছিন্ন করে এবং দ্বিতীয়বার উন্মুক্ত ভিত্তি হিসেবে। ফলে আইসিসিতে ইউক্রেন নিজে অভিযোগ করতে পারবে না। কিন্তু দেশটির ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের তদন্ত করার এখতিয়ার রয়েছে আইসিসির।

২০১৬ সালে আইসিসি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয় রাশিয়া। আদালতের একটি প্রতিবেদনে ক্রিমিয়াকে রুশ ভূখণ্ডে একীভূত করার ঘটনাকে দখল হিসেবে উল্লেখ করার পর আইসিসি থেকে বেরিয়ে যায় মস্কো। কারণ দখল বলার কারণে রুশ পদক্ষেপকে আগ্রাসন বলা যাবে। আইসিসি’র সংজ্ঞা অনুসারে, কোনও রাষ্ট্র দখল, বোমাবর্ষণ বা বন্দরে অবরোধ করা আগ্রাসনের আওতায় পড়ে। কিন্তু যদি কোনও রাষ্ট্র আইসিসি’র অন্তর্ভুক্ত না হয় তাহলে দেশটির কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে আগ্রাসনের অপরাধে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম হলো, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ আগ্রাসনের অভিযুক্ত দেশের বিচারের বিষয়টি আইসিসিতে পাঠাতে পারে। কিন্তু রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে দেশটির ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। ফলে এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মতো অভিযোগের বিচারে রাশিয়ার মতো স্বাক্ষর না করা দেশের বিরুদ্ধে বিচারে কোনও বাধা নেই।

পুতিনের বিচারের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর পদক্ষেপের কারণে সরাসরি রাজনৈতিক নেতার জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণ  করা অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি পুতিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেও তাকে আইসিসিভুক্ত কোনও দেশে গ্রেফতার করতে হবে। যে দেশগুলো আদালতটির এখতিয়ার স্বীকার করে।

পুতিন বা অন্যদের বিচারের আওতায় আনার বিকল্প উপায় কী আছে?

জাতীয়তা নির্বিশেষে যে কোনও দেশের আদালত ব্যক্তির বিচার করতে পারে। যদি অপরাধের ঘটনাস্থলে কথিত ‘ইউনিভার্সেল জুরিসডিকশন ল’ থাকে। যেমন, জানুয়ারিতে জার্মানির একটি আদালত সিরিয়ার সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে গৃহযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। ২০১৫ সালে জার্মানিতে রুয়ান্ডার দুই ব্যক্তিকে কঙ্গোতে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে যুদ্ধাপরাধের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

রাশিয়ারও ‘ইউনিভার্সেল জুরিসডিকশন ল’ রয়েছে। কিন্তু অন্য দেশের রাষ্ট্র প্রধানের বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগ করা হলেও পুতিনকে গ্রেফতার করে কাঠগড়ায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। এজন্য তাকে ক্ষমতা থেকে সরতে হবে এবং নতুন রুশ সরকার কর্তৃক আদালতে পাঠাতে হবে। যে নতুন সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আন্তরিক সম্পর্ক থাকতে হবে।

ইন্টারন্যাশনাল কোর্টস অ্যান্ড ট্রাইব্যুনালের ইউসিএল প্রকল্পের ডিরেক্টর অধ্যাপক ফিলিপ স্যান্ডস কিউসি আগ্রাসনের অভিযোগে পুতিন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। এই অধ্যাপক মনে করেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার কর্মকাণ্ডে এই অপরাধই বেশি যৌক্তিক।

ইউক্রেনের দাবি, মিথ্যা গণহত্যার অভিযোগ তুলে রাশিয়া দেশটিতে হামলা চালিয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে)-এর শরণাপন্ন হয়েছে কিয়েভ। কিন্তু বিচারিক এখতিয়ারের কারণে এই উদ্যোগকেও প্রতীকী হিসেবে মনে করা হচ্ছে।