মার্চ মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির মিত্ররা যখন রাশিয়ার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করে তখন হোয়াইট হাউজে দাঁড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছিলেন, তারা চান পুতিনের যুদ্ধের মেশিনে শক্তিশালী আঘাত হানতে।
কিন্তু ইউক্রেনের যুদ্ধ যখন ১০০তম দিনের দিকে গড়াচ্ছে তখন সেই যুদ্ধের মেশিন এখনও খুবই সক্রিয়। রাশিয়াতে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়েছে। এই বছরে প্রতিদিন যা গড়ে ৮০০ মিলিয়ন ডলার হতে পারে। আর এটি এসেছে কেবল তেল ও গ্যাসে সুপারপাওয়ার হওয়ার কারণে।
বহু বছর ধরে রাশিয়া একটি বড় পণ্যের সুপারমার্কেট হিসেবে কাজ করেছে। বিশ্বের কাছে প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করেছে। তা শুধু জ্বালানি নয়। গম, নিকেল, অ্যালুমিনিয়াম ও প্যালাডিয়ামও। ইউক্রেনে আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের এই সম্পর্ক পুনর্বিবেচনায় বাধ্য হয়েছে। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগবে। কিন্তু ইইউ এক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে কয়েক ধাপ। এই সপ্তাহেই তারা রুশ তেল আমদানিতে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। রুশ তেল আমদানি দুই-তৃতীয়াংশ নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে ব্লকটি।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় অক্ষত থাকেনি রাশিয়া। এগুলোর ফলে উন্নত বিশ্বে দেশটি একঘরে হয়ে পড়েছে। কর্পোরেট জায়ান্টরা দেশ ত্যাগ করেছে, অনেকে বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ রেখে চলে গেছে, অর্থনীতি গড়াচ্ছে ভয়াবহ মন্দার দিকে। কিন্তু পুতিন আপাতত এই ক্ষতি অগ্রাহ্য করতে পারেন। কারণ পণ্য বিক্রি থেকে তার কোষাগার উপচে পড়ছে। ইউক্রেনে যুদ্ধের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অংশে মূল্যবৃদ্ধির কারণে রুশ পণ্য আরও আকর্ষণীয় হয়েছে অনেকের কাছে।
কয়েকটি দেশ রুশ জ্বালানি কেনা বন্ধ বা স্থগিত করেছে। তবে এরপরও এই বছর তেল-গ্যাস বিক্রি থেকে রাশিয়ার আয় ২৮৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। রুশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে এই প্রাক্কলন করেছে ব্লুমবার্গ ইকনোমিকস। যা ২০২১ সালের আয়কে ছাড়িয়ে যাবে। অন্যান্য পণ্য বিক্রি থেকে আরও আয় হতে পারে ৩০০ বিলিয়ন ডলার। নিষেধাজ্ঞার কারণে পশ্চিমা দেশে রাশিয়ার জব্দ করার বিদেশি রিজার্ভের তুলনায় যার পরিমাণ বেশি।
ইইউ নেতারা জানেন যে, তাদের উচিত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল-গ্যাস কেনা এবং ইউরোপে চলমান যুদ্ধে পরোক্ষভাবে অর্থায়ন বন্ধ করা উচিত। কিন্তু এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পূরণের ক্ষেত্রে দেশগুলোর সরকার জানে যে, নিজেদের অর্থনীতিতে এর পরিণাম ভোগ করতে হবে।
এই সপ্তাহে রুশ তেলে আংশিক নিষেধাজ্ঞা জারিতে ইউরোপীয় নেতারা একমত হয়েছেন। এর ফলে রাশিয়ার ওপর ষষ্ঠ দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথ সুগম হলো। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে তাদের কয়েক সপ্তাহ বিতর্ক ও বিরোধিতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
ওয়াশিংটনের পিটারসন ইন্সটিটিউটের সিনিয়র ফেলো জেফ্রি স্কট বলেন, নিষেধাজ্ঞা ব্যবহারে সব সময় রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা থাকে। চেষ্টা থাকে যার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় সেজন্য বেশি ভুক্তভোগী হয় এবং নিজ দেশে এর প্রভাব যেন কম পড়ে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এটি বলার চেয়ে করা অনেক কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন কর্মকর্তারা বিতর্ক করছেন রাশিয়ার ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়ানোর উপায় নেই। সম্ভাব্য উপায় হিসেবে আলোচনায় রয়েছে রুশ তেলের মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া অথবা বিভিন্ন দেশ ও কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, যারা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করছে। কিন্তু এমন নিষেধাজ্ঞায় গভীর বিভাজন তৈরি হতে পারে এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
ইতোমধ্যে রুশ তেলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইউরোপ ধীরে ধীরে রুশ তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর দিকে এগোচ্ছে। এর ফলে মস্কো অন্যত্র বাজার খোঁজার সময় পেয়ে যাচ্ছে। যেমন- চীন ও ভারত। যে বাজারে পণ্য বিক্রি করে রফতানি আয়ের ক্ষতি এবং আর্থিক যুদ্ধের কারণে কোষাগার সংকুচিত হওয়া ঠেকাতে পারবে।
এর অর্থ হলো, রাশিয়ার অ্যাকাউন্টে অর্থের প্রবাহ চলমান রয়েছে এবং আর্থিক সংখ্যা মনে করিয়ে দিচ্ছে পশ্চিমাদের নাটকীয় পরিবর্তন প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-র মতে, তেল-গ্যাসের রফতানি আয় আগের বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। মস্কোভিত্তিক একটি ইনভেস্টমেন্ট রিসার্চ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে, রাশিয়ার শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী এক দশকের মধ্যে বছরের প্রথম চার মাসে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করেছে। সঙ্গে গম রফতানি অব্যাহত রয়েছে চড়া মূল্যে। রাশিয়ার কৃষিপণ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বিবেচনাও করা হচ্ছে না কারণ বিশ্বের জন্য খাদ্যশস্য প্রয়োজন।
আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই বছরের প্রথম চার মাসে রাশিয়ার উদ্বৃত্ত প্রায় ৯৬ বিলিয়ন ডলার বেশি। ১৯৯৪ সালের পর এটি সর্বোচ্চ সংখ্যা। এটি মূলত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিফলন।
রুশ মুদ্রা রুবলও পুতিনের শক্তি প্রদর্শনের আরেকটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে। একসময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রুবলকে ‘রাবল’ (ধ্বংসস্তূপ) হিসেবে ব্যঙ্গ করেছিলেন। নিষেধাজ্ঞা আরোপের শুরুতে রুবলের দরে ধস নামলে বাইডেন এই মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে বিশ্বে এই বছরের সবচেয়ে ভালো পারফর্মিং মুদ্রায় পরিণত হয়েছে তা।
পণ্য সুপারপাওয়ার হিসেবে রাশিয়ার অবস্থানের সুবিধা নেওয়ারও চেষ্টা করেছেন পুতিন। খাদ্য সংকটের আশঙ্কার মধ্যে তিনি বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলেই কেবল তিনি খাদ্যশস্য ও সার রফতানির অনুমতি দেবেন।
বার্লিনভিত্তিক জার্মান ইন্সটিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স-এর পূর্ব ইউরোপ ও ইউরেশিয়া বিষয়ক সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট জ্যানিস ক্লুগ বলেন, নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য যদি হয়ে থাকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীকে থামানো, তাহলে তা বাস্তব সম্মত ছিল না। রাশিয়া এখনও যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহ করতে পারছে, নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে নিজ দেশের ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে কিছু ক্ষতিপূরণ দিতে পারছে তারা।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার একটি ফাঁক হলো অন্য দেশগুলো রুশ তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে এবং কিছুক্ষেত্রে তা ছাড় দেওয়া মূল্যে কেনার সুযোগ পাচ্ছে দেশগুলো।
ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে মে মাস পর্যন্ত ভারত ৪০ মিলিয়ন ব্যারেল অতিরিক্ত তেল কিনেছে। ২০২১ সালে রাশিয়া-ভারত তেল প্রবাহের তুলনায় তা ২০ শতাংশ বেশি। বাজারের দরের তুলনায় কম মূল্যে তেল কিনতে শোধনকারীরা সরকারি দরপত্র এড়িয়ে যাচ্ছে তারা।
চীনও রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সম্পর্ক শক্তিশালী করছে। অন্যত্র বিক্রি করতে না পারা রুশ তেল কম দামে কিনছে তারা। রুশ তেলের আমদানি বাড়িয়েছে তারা এবং কৌশলগত মজুত বাড়াচ্ছে।
স্টিল ও ভালো মানের কয়লা উৎপাদনকারীদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। টানা তৃতীয় মাস এপ্রিলেও রাশিয়া থেকে আমদানি বেড়েছে। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ। কিছু রুশ তেল ও কয়লা বিক্রেতা চীনের ক্রেতাদের ইউয়ানে কেনার সুযোগ দিয়ে পুরো প্রক্রিয়া আরও সহজ করছে।
রটেরডামভিত্তিক এরাসমুস ইউনিভার্সিটির এরাসমুস কমোডিটি অ্যান্ড ট্রেড সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক উয়াওটার জ্যাকবস বলেন, বিশাল বিশ্বের অনেকাংশই নিষেধাজ্ঞা আরোপে জড়িত নয়। বাণিজ্য চালিয়ে যেতে হবে, জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের ক্রেতারা এগিয়ে আসছে।
আর.পলিটিক-এর প্রতিষ্ঠাতা তাতিয়ানা স্টানোভায়া বলেন, ক্রেমলিনে এক ধরনের আশাবাদ এবং নিষেধাজ্ঞায় রুশ অর্থনীতি ধসে না পড়ায় বিস্ময় রয়েছে। কিন্তু আগামী দুই থেকে তিন বছরের দিকে থাকালে অনেক প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে, কীভাবে জ্বালানি ও উৎপাদন খাত টিকে থাকবে।
সূত্র: ব্লুমবার্গ