রাশিয়াকে যেভাবে ‘বোকা’ বানালো ইউক্রেন

বেশ কিছুদিন ধরে ইউক্রেন দক্ষিণাঞ্চলে রাশিয়ার দখলকৃত অঞ্চল মুক্ত করতে অভিযান শুরু করার কথা বলে আসছিলেন দেশটির সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা। দক্ষিণাঞ্চলের পাল্টা আক্রমণ নিয়ে ঢাক-ঢোল পেটালেও আসলে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছিল খারকিভ অঞ্চল মুক্ত করার অভিযানে। ইউক্রেনের স্পেশাল ফোর্স বলছে, দক্ষিণাঞ্চলে আক্রমণের কথা বলা হচ্ছিল মূলত রাশিয়ার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য। এটি ছিল একটি বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা। যাতে করে রাশিয়াকে কৌশলে বিভ্রান্ত করা যায়। শনিবার গুরুত্বপূর্ণ ইজিউম শহরে প্রধান ঘাঁটি থেকে রুশ সেনাদের অস্ত্র-গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম রেখে পালিয়ে যাওয়ার পর ইউক্রেনীয়দের এই কৌশল কাজে লেগেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এখবর জানিয়েছে।

ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ার দখলকৃত অঞ্চল মুক্ত করতে অপ্রত্যাশিত ও দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করছে। মাত্র তিনদিনে দখলকৃত খারকিভ অঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশ তারা মুক্ত করতে সফল হয়েছে। শনিবার রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও ইউক্রেনের ভূখণ্ড মুক্ত করার কথা নিশ্চিত করেছে।

সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা থেকে ইউক্রেনের স্পেশাল ফোর্সের বহুন ব্রিগেডের প্রেস কর্মকর্তা হওয়ার তারা বেরেজোভেটস বলেন, এটি ছিল বড় ধরনের অপপ্রচার অভিযান। রাশিয়া ভেবেছিল আমরা দক্ষিণে পাল্টা আক্রমণ করব। সেই অনুসারে তারা সামরিক সরঞ্জাম ওই অঞ্চলে মোতায়েন করেছে। এরপর দক্ষিণের পরিবর্তে আমরা এমন জায়গায় আক্রমণ করেছি যা তারা কখনও প্রত্যাশা করেনি। এতে তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং পালিয়ে যায়।

২৯ আগস্ট ইউক্রেনীয় দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ড ঘোষণা দেয় খেরসন অঞ্চলে তাদের বহুল প্রতীক্ষিত পাল্টা আক্রমণ শুরু হয়েছে। কিন্তু ওই সময় খেরসনে ফ্রন্টলাইনে থাকা সেনারা বলেছিল তাদের কাছে কোনও ইঙ্গিত বা প্রমাণ নেই যাতে মনে হয় আক্রমণ শুরু হয়েছে। কিংবা সেখানে কোনও সক্রিয় যুদ্ধ হচ্ছে না। যা হচ্ছে কিছু দিন আগে রাশিয়ার আক্রমণের পাল্টা প্রতিক্রিয়া ছিল।

গত দুই সপ্তাহ ধরে ইউক্রেনীয় সেনারা দক্ষিণাঞ্চলে বেশ কয়েকটি গ্রাম মুক্ত করেছে। তবে এসব আক্রমণের ক্ষেত্রে রাশিয়ার শক্তির কথা উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি কোনও হতাহতের কথাও ঘোষণা করা হয়নি।

তবে এই অগ্রগতি জুলাই ও আগস্ট মাস ধরে খেরসনে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ধীরগতির কিন্তু সীমিত সাফল্যের চেয়ে ব্যতিক্রম কিছু ছিল না। এরপরও মাত্র কয়েক হাজার বাসিন্দার খেরসনের ছোট ছোট গ্রাম দখল হঠাৎ করে বড় আন্তর্জাতিক খবর হয়ে যায়।

ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ডের মুখপাত্র নাতালিয়া হুমেনিউক খেরসনের রণক্ষেত্রে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ও শাসকদের নীরবতার প্রতি জোর দিয়েছিলেন।

কিন্তু বেরেজোভেটস বলছেন, সংবাদমাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের আক্রমণ নিয়ে ব্যাপক প্রচার ছিল ইউক্রেনের দ্বারা পরিচালিত একটি সমন্বিত অপপ্রচার অভিযান। যা রাশিয়ার সেনাবাহিনীকে টার্গেট করে পরিচালিত হয়েছে এবং কয়েক মাস ধরে এই প্রচরাভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।

তিনি বলছেন, এই প্রচারণা রাশিয়াকে সামরিক সরঞ্জাম ও সেনা দক্ষিণাঞ্চলীয় ফ্রন্টে পাঠাতে উসকে দিয়েছে। এমনকি খারকিভ অঞ্চল থেকেও একাংশ সেনা সেখানে মোতায়েন করেছে রাশিয়া। এই সময়ের মধ্যে খারকিভে আমাদের বাহিনীর কাছে পশ্চিমাদের পাঠানো অত্যাধুনিক সেরা অস্ত্রগুলো দেওয়া হয়েছে।

অভিযান সম্পর্কে জ্ঞাত একটি সামরিক সূত্র জানায়, এই বিশেষ অভিযানের একটি লক্ষ্য ছিল ইউক্রেন নিয়ন্ত্রিত খারকিভের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রুশ তথ্য দাতাদের নিমূল করা। যাতে করে তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয়দের প্রস্তুতির তথ্য পাচার করতে না পারে।

সূত্র মতে, তথ্য পাচারকারীদের পুরোপুরি নির্মূল করা হয়েছে। তারা বেশিরভাগই ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিক। কিন্তু ইউক্রেনীয় নাগরিকের ছদ্মবেশে বেশ কয়েকজন রুশ গুপ্তচর ছিল। কী ঘটছে তা সম্পর্কে রুশদের কোনও ধারণা ছিল না।

ইউজিউমের সামরিক ঘাঁটি থেকে রুশ সেনাদের প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। তারা এর কারণ হিসেবে বলছে রুশ সেনাদের পুনরায় সংগঠিত করা। মন্ত্রণালয় বলেছে, ডনেস্ক রণক্ষেত্রে বালাকলিয়াতে নিজেদের উদ্যোগ শক্তিশালী করতেই ইজিউম থেকে সেনাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে।

রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইগো কোনাশেনকভ বলেছেন, ইজিউম থেকে বালাকলিয়াতে সেনা ও সরঞ্জাম স্থানান্তরে তিন দিনব্যাপী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।  

ইজিউমের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেছেন, ইউক্রেনীয় সেনারা শহরটিতে প্রবেশ করেছে। এর আগে রুশ দখলদারবাহিনী দ্রুত পিছু হটে। তারা গোলা-বারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম রেখে পালিয়ে গেছে।