ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর নিউ ইয়র্কে চলছে তীব্র ও বিশৃঙ্খল লড়াই। যুদ্ধের আগে শহরটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার। বেশিরভাগ লোক কমিউনিস্ট যুগের ফেনল কারখানায় কাজ করত। তবে এখন সেই কারখানাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অধিকাংশ বাসিন্দা ভারী গোলাবর্ষণ ও ক্রমাগত পরিবর্তনশীল ফ্রন্ট লাইনের কারণে শহরটি ছেড়ে চলে গেছেন।
একজন ইউক্রেনীয় সেনা টেলিগ্রামে বুধবার লিখেছেন, শহরটি প্রায় অস্তিত্বহীন, কারণ একটি ভবন আমাদের নিয়ন্ত্রণে, আরেকটি রুশদের দখলে, আবার অন্য একটি ভবন আমাদের হাতে।
যুদ্ধের মানচিত্র ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রকাশকারী একটি ইউক্রেনীয় টেলিগ্রাম চ্যানেল ডিপ স্টেট জানিয়েছে, দুই পক্ষেই বিশৃঙ্খলা চলছে।
বর্তমানে নিউ ইয়র্কে বিস্ফোরণের গর্ত, ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও তড়িঘড়ি করে খনন করা কবরের চিত্র দেখা গেছে। শহরটি পোক্রোভস্ক থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা ঘাঁটি। রাশিয়ার বাহিনী শহরটির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
মস্কো দাবি করেছে, তারা নিউ ইয়র্ক দখল করেছে। কিন্তু কিয়েভ বলছে, এখনও শহরটির কিছু অংশে প্রতিরোধ চলছে এবং রুশরা শহরটির চারপাশে তোরেস্কের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। রাশিয়ার শীর্ষ কর্তৃপক্ষ প্রায়শই দাবি করে, তারা পুরোপুরি ইউক্রেনীয় শহর দখল করেছে। যদিও সেগুলো আসলে দিনের পর দিন বা সপ্তাহ ধরে বিবাদমান অবস্থায় থাকে।
ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে সংঘর্ষের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যখন পশ্চিমাঞ্চলে কিয়েভের সফল অপ্রত্যাশিত অভিযান বিশ্বব্যাপী মনোযোগ কেড়েছে। কিন্তু এই অভিযানের কারণে ডনেস্কের সংকটময় পরিস্থিতি সংবাদ প্রতিবেদনে আড়াল হয়েছে।
ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক উপ-প্রধান জেনারেল লেফটেন্যান্ট ইহোর রোমানেঙ্কো সতর্ক করে বলেছেন, কিয়েভকে তার পূর্বাঞ্চলের বিপজ্জনক অগ্রগতি ঠেকাতে মনোযোগ দিতে হবে। কারণ এখানে এটি শুধু রুশদের দ্বারা দখলকৃত আবাসিক এলাকাগুলোর বিষয় নয়, এটি পুরো অঞ্চলের জন্য একটি গুরুতর হুমকির বিষয়।
নিউ ইয়র্কে রাশিয়ার মর্টারের আঘাতে এক বৃদ্ধ ব্যক্তি তার বাড়ির পেছনে নিহত হন। তার নাতি শহরের যে কারও কাছে অনুরোধ করেছেন তার কবরের ছবি তুলে দিতে। তিনি বৃহস্পতিবার ভোর ৩টার দিকে নিউ ইয়র্কারদের জন্য একটি টেলিগ্রাম চ্যাটে লিখেছেন, যদি পারেন সাহায্য করুন। আপনাকে ধন্যবাদ এবং ঈশ্বর আপনাকে রক্ষা করুন। এখনও কেউ এর জবাব দেয়নি।
নিউ ইয়র্কে যারা রয়ে গেছেন, তারা হয়তো খুব বৃদ্ধ বা প্রতিবন্ধী, বা মস্কোর অধীনে জীবনযাপন করতে চান। যদিও তারা ধ্বংস ও মৃত্যুর সম্মুখীন হচ্ছেন।
রুশ হামলার আগে সেখান থেকে পালানো নাদিয়া গর্ডিউক নামের এক শিক্ষক বলেছেন, সমস্যা হলো তারা এখনও বুঝতে পারেনি রাশিয়া কী নিয়ে আসে।
নিউ ইয়র্কের নিকটবর্তী বিচ্ছিন্নতাবাদী-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা রুশ সম্প্রচার দেখতে বা শুনতে পারেন এবং ক্রেমলিনের যুদ্ধের বর্ণনায় প্রভাবিত হতে পারেন।
গর্ডিউকের মতে, তাদের মস্তিষ্কে পুরোপুরি বিপর্যয় ঘটেছে। রাশিয়ার টিভি তাদের বাড়িতে আঘাত হানা রুশ শেলের চেয়ে ভালো কাজ করেছে।
রাশিয়াপন্থি বিদ্রোহীরা ২০১৪ সালে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য নিউ ইয়র্ক দখল করেছিল। তীব্র লড়াইয়ের পর তাদের বিতাড়িত করা হয়। নিউ ইয়র্কের কাছাকাছি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত শহর হোরলিভকা একটি পাহাড় থেকে দেখা যায়। যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত স্থানীয়দের স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।
নিউ ইয়র্কের লড়াইটি তোরেস্কের দিকে রাশিয়ার অগ্রগতির একটি অংশ। শহরটি ঘনবসতিপূর্ণ শিল্প এলাকা যেখানে সোভিয়েত যুগের কারখানাগুলো কয়লা খনির পাশে দাঁড়িয়ে আছে এবং প্রাকৃতিকভাবে সমতল ভূমি ব্যবহার করে সেখানে তৈরি করা হয়েছে টিলা।
এছাড়া শহরটি বাখমুত থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। এই শহরটি ২০২৩ সালের মে মাসে রাশিয়ার ভাড়াটে সেনা এবং প্যারোলে মুক্তি পাওয়া কয়েদিদের দ্বারা দখল করা হয়েছিল। ১০ মাসের অবরোধ, ভারী বোমাবর্ষণ এবং হাজার হাজার সেনার ক্ষয়ক্ষতির পর রুশ সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরে প্রবেশ করে।
রাশিয়া পূর্ব ইউক্রেনে প্রতিটি গ্রাম ও শহরকে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার যে কৌশল অবলম্বন করেছে, তা এই বছর ১ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকা দখলের অংশ। এটি হলো তাদের সবচেয়ে বড় ভয়—কারণ শহরটি হয়তো পরবর্তী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।
সূত্র: আল জাজিরা