ভাগ্যনির্ধারণী নির্বাচনের মুখে বাংলাদেশ: আইসিজি

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনার পতনের পর এটিই দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। বেলজিয়ামভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংকট নিরসন বিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)-এর বিশেষজ্ঞ থমাস কিন এক বিশ্লেষণে এই ঐতিহাসিক ভোটের গুরুত্ব ও চ্যালেঞ্জসমূহ তুলে ধরেছেন। বিশ্লেষণটি ২ ফেব্রুয়ারি সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার এবারের নির্বাচনে অংশ নেবেন। কয়েক কোটি তরুণ ভোটারের জন্য এটিই হবে জীবনে প্রথমবার কোনও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০১৪ ও ২০২৪ সালে বিরোধীরা ভোট বয়কট করে এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আড়ালে দুর্নীতি ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত ছাত্র-জনতার আন্দোলনের রূপ নেয়, যা ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। তাদের প্রধান কাজ ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন। শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) পুনর্গঠন করা হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়, যা আগামী সরকারের জন্য সংস্কারের একটি রূপরেখা হিসেবে কাজ করবে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় শিথিলতা এবং উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর প্রতি নমনীয়তার অভিযোগও তুলেছেন কেউ কেউ।

এবারের নির্বাচনের বড় বৈশিষ্ট্য হলো দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি। নিরাপত্তা ও সহিংসতার অভিযোগে দলটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ এবং নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আইসিটি শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে।

মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে দুটি শিবিরের মধ্যে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরা তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে দলের তৃণমূল পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ দলটির ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন দলটিকে নতুন করে উজ্জীবিত করেছে।

শেখ হাসিনার পতনের পর জামায়াতে ইসলামীর জনপ্রিয়তা বেড়েছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। দলটি এবার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোট বেঁধেছে। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত এবার তাদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল অর্জনের পথে রয়েছে।

জুলাই সনদে ৪৮টি সাংবিধানিক পরিবর্তনসহ মোট ৮৪টি প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস, বিচার বিভাগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। নির্বাচনের দিনই এই সনদের ওপর একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক সহিংসতা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৬ জন রাজনীতিক প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তীতে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীসহ ৯ লাখেরও বেশি নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হবে।

পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সামনে বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-  পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতি সচল রাখা, ভারত ও অন্যান্য শক্তিধর দেশের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক নিরসন, ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার সমাধান, রাজনৈতিক সমঝোতা ও আওয়ামী লীগের ফেরার পথ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন।

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার একটি স্থিতিশীল পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করলেও, চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করছে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের নিরপেক্ষতা এবং পরবর্তী সরকারের সংস্কার বাস্তবায়নের সদিচ্ছার ওপর।