বিশ্বের অনেক দেশের রাজধানী তাদের ইতিহাস, স্থাপত্য কিংবা সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু এমন একটি রাজধানী শহর রয়েছে, যা বিশ্বের বুকে অনন্য কেবল তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে। সুদূর সুমেরু বৃত্তের কাছাকাছি অবস্থিত এই শহরটিতে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিতে দেখা যায় নাটকীয় রূপ বদল; যার মধ্যে রয়েছে গ্রীষ্মকালে প্রায় ২৪ ঘণ্টা দিনের আলো আর শীতকালে দীর্ঘ, অন্ধকার রাত। দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থান হওয়া সত্ত্বেও এটি নর্ডিক অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় এক নগর কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকাভিক বিশ্বের সবচেয়ে উত্তরতম সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। প্রায় ৬৪ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত এই শহরটি বিশ্বের অন্য যেকোনও দেশের রাজধানীর চেয়ে অনেক বেশি উত্তরে অবস্থিত। এমন চরম ভৌগোলিক অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও রেইকাভিক কিন্তু আইসল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের আবাসস্থল। একই সঙ্গে এটি দেশটির রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে।
রেইকাভিক নগর জীবন ও অসাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশের এক অপূর্ব মিশ্রণ। মধ্যরাতের সূর্য, আগ্নেয়গিরি থেকে শুরু করে মেরুজ্যোতি আর উষ্ণ প্রস্রবণের মতো বিস্ময়কর সব উপাদানের কারণে এর অবস্থান একে পৃথিবীর অন্য যেকোনো রাজধানী শহরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা করে তুলেছে।
উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থানের কারণে রেইকাভিকে কিছু অদ্ভুত প্রাকৃতিক ঘটনা ঘটে, যা বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি আকর্ষণ হলো- গ্রীষ্মের কিছু সময়ে আকাশে প্রায় ২৪ ঘণ্টাই দিনের আলো থাকা, শীতকালে দিনের আলোর মেয়াদ খুবই সংক্ষিপ্ত হওয়া, ঠান্ডার মাসগুলোতে রাতের আকাশে চোখ ধাঁধানো মেরুজ্যোতি বা নর্দার্ন লাইটস দেখার সুযোগ এবং আগ্নেয়গিরির ল্যান্ডস্কেপ, হিমবাহ এবং ভূ-তাপীয় অঞ্চলের সহজ সান্নিধ্য। প্রকৃতির এই দুই চরম বৈপরীত্যই মূলত শহরটির প্রধান সৌন্দর্য ও আবেদন।
অন্যান্য বড় বড় রাজধানীর মতো যান্ত্রিক নয় রেইকাভিক; বরং এটি ঘেরা অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্যে। শহরটি থেকে পর্যটকেরা খুব সহজেই আইসল্যান্ডের বিখ্যাত কিছু প্রাকৃতিক স্থান ঘুরে দেখতে পারেন, যার মধ্যে রয়েছে ব্লু লাগুন, গোল্ডেন সার্কেল, আগ্নেয়গিরির ক্ষেত্র ও লাভা ল্যান্ডস্কেপ এবং নজরকাড়া জলপ্রপাত ও ভূ-তাপীয় উষ্ণ প্রস্রবণ। প্রকৃতির এত কাছাকাছি হওয়ায় আইসল্যান্ড ভ্রমণের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ধরা হয় এই শহরকে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি শহরের ভেতরেও ঘুরে দেখার মতো অনেক কিছু রয়েছে। এর মধ্যে হলগ্রিমসকির্কা চার্চ, হার্পা কনসার্ট হল, সান ভয়েজার ভাস্কর্য এবং ওল্ড হারবার এলাকা অন্যতম জনপ্রিয়। শহরটি বেশ ছিমছাম ও কমপ্যাক্ট হওয়ায় পায়ে হেঁটেই পুরো কেন্দ্রস্থল ঘুরে দেখা যায়।
বছরের প্রতিটি ঋতুই রেইকাভিকে দেয় ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার স্বাদ। গ্রীষ্মকালে (জুন থেকে আগস্ট) দেখা মেলে মধ্যরাতের সূর্য এবং দীর্ঘ দিনের আলো, যা মনোরম তাপমাত্রায় দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার ও বাইরে ঘুরে বেড়ানোর দারুণ সুযোগ করে দেয়। অন্যদিকে শীতকালে (সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ) চারপাশ বরফে ঢেকে যায় এবং তখন প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে মেরুজ্যোতি বা নর্দার্ন লাইটস দেখা ও শীতকালীন নানা উৎসব।
সূত্র: এনডিটিভি