মোদির পাশে থাকবেন জাকির নায়েক

জাকির নায়েকবিতর্কিত ইসলামি চিন্তাবিদ জাকির নায়েক জানিয়েছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি যদি মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য কাজ করতে চান তাহলে মোদির পাশে থাকবেন তিনি। সৌদি আরবের জেদ্দায় অবস্থান করা জাকির নায়েক টেলিফোনে দ্য ইকোনোমিক টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে বলতে গিয়ে জাকির নায়েক বলেন, মোদিই ভারতের একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যিনি গত দুই বছরে অনেক মুসলিম দেশ সফর করেছেন। এতে করে মুসলিম দেশ ও ভারতের সম্পর্কের উন্নতি হবে।
জাকির নায়েক বলেন, যদি তার (মোদি) উদ্দেশ্য হয় হিন্দু ও মুসলমান এবং ভারতের সঙ্গে মুসলিম দেশগুলোর সম্পর্কের উন্নতি করা, তাহলে আমি সম্পূর্ণভাবে তার পাশে থাকব।
মোদির সৌদি আরব সফর নিয়ে এ ইসলাম প্রচারক বলেন,মুসলিম দেশগুলোও তার (মোদি) উদ্দেশ্য বুঝতে পারছে। যখন তিনি সৌদি আরব সফর করেন তখন বাদশা সালমান তাকে সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব দিয়েছেন। হিন্দুত্ব বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্ম এবং ভারতে প্রচুর মুসলিম মানুষ রয়েছে। তাই, যদি প্রধানমন্ত্রী মুসলিম দেশগুলোর কাছাকাছি নিজেকে নিয়ে যেতে পারেন, তাহলে ভালো। এতে করে ভারতে বিনিয়োগও আসবে। এই সব দেশ যদি একত্রিত হয় তাহলে ভারত পরাশক্তিতে পরিণত হবে। অতীতে ভারত পরাশক্তি ছিল এবং এই অবস্থায় আবার ফিরে আসতে পারবে।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর হয়ে তরুণদের জঙ্গিবাদে উৎসাহিত করার অভিযোগ ওঠলেও জাকির নায়েক সাক্ষাৎকারে আইএসের সমালোচনা করেছেন। ইসলামিক স্টেটকে অ্যান্টি-ইসলামিক স্টেট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে জিহাদ নিয়েও ভুল প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

জাকির নায়েক বলেন, জিহাদ অর্থ হচ্ছে সমাজকে আরও উন্নত করার জন্য লড়াই ও সংগ্রাম। জিহাদ মানে আত্মরক্ষা। কিন্তু ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে জিহাদকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ফলে অমুসলিমরা এমনকি মুসলমানরাও জিহাদকে ভুল বুঝছে। আইএস নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করছে, যা কোরআন অনুসারে মানবতাবিরোধী অপরাধ। আমি তাদের অ্যান্টি ইসলাম স্টেট বলি। তারা ইসলামকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছে। যদি গুজরাতে কোনও হিন্দু মুসলমানকে হত্যা করে তাহলে মুম্বাইয়ে মুসলমান দ্বারা হিন্দু হত্যাকে ন্যায় সঙ্গত বলা যায় না।

সাক্ষাৎকারে জানতে চাওয়া হয়েছিল কবে ভারতে ফিরবেন তিনি। জবাবে স্পষ্ট কোনও উত্তর দেননি তিনি। জাকির নায়েক বলেন, ভারত সরকার কিংবা সংস্থা যখন চাইবে তখন দেশে ফিরব।

তার অনুসারীরা কীভাবে জঙ্গি হয়ে ঢাকায় হামলা চালালো- এমন প্রশ্নের জবাবে জাকির নায়েক বলেন, ৩ জুলাই বিষয়টি প্রথম বাংলাদেশের পত্রিকায় আসে এবং পরে ৪ জুলাই আসে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। বাংলাদেশি পত্রিকাটি তাদের ভুল স্বীকার করলেও ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম আমাকে বিচারের মুখোমুখি করেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, আমি কোনও রাজনৈতিক দলের কথা জানি না কিন্তু কিছু রাজনীতিবিদ আছেন যারা আমার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার প্রতি আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে।

সম্প্রতি ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং তার বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে জাকির নায়েক বলেন, আমার বিরুদ্ধে রাজনাথ সিংয়ের একটি বিবৃতি পড়িনি আমি। তিনি জানিয়েছেন অনুসন্ধান করবেন। এটা করার অধিকার তার রয়েছে। আমি যদি ভারতীয় সংবিধানের কোনও আইন ভঙ্গ করে থাকি তাহলে বিচারের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত আমি। আমি চ্যালেঞ্জ করছি, আমার দেওয়া কোনও বক্তব্য ভারতের সংবিধান ও দেশের ক্ষতি করার কথা বলা হয়েছে কেউ তা প্রমাণ করতে পারবে না।

তার জনপ্রিয়তায় অনেকে ঈর্ষান্বিত জানিয়ে জাকির নায়েক বলেন, অনেক মানুষ আমার জনপ্রিয়তা মেনে নিতে পারছে না। ইসলামে বিভাজন তৈরি হারাম। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, আমি সুন্নি না শিয়া। আমি বলব আমি মুসলিম, আমি এই ধরনের কোনও বিভাজনে পড়ি না। দুর্ভাগ্যক্রমে, মুসলিমরা বিভক্ত যা কোরআন অনুমোদন দেয় না।

হিন্দুদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিক করা প্রসঙ্গে জাকির নায়েক বলেন, আমি কাউকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে জোর করি নাই। আমার বক্তব্য শুনে কয়েক হাজার মানুষ ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন কিন্তু আল্লাহ তাদের পথ দেখিয়েছেন। কেউ যদি শান্তির ধর্ম গ্রহণ করতে চায় আমি তাকে বাধা দিতে পারি না। ভারতীয় সংবিধানের ২৫ ধারায় বলা হয়েছে, যে কারও ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার রয়েছে। আমি খুব গর্বিত ও খুশি একজন ভারতীয় ও ভারতীয় মুসলিম হিসেবে।

এদিকে, জাকির নায়েকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আরশিত কুরেশিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস খবরটি নিশ্চিত করেছে। তারা জানিয়েছে, কোচিতে হওয়া এক মামলার ভিত্তিতেই ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মহারাষ্ট্রের নাভি-মুম্বাই এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মহরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট এবং কেরালা পুলিশের এক যৌথ দল তাকে গ্রেফতার করে। নবি মুম্বইয়ের সিউডের ফ্ল্যাট থেকে গ্রেফতার করে আরশিদকে সিবিডি-বেলাপুরের একটি আদালতে পেশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরশাদ জাকিরের ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে জানা গেছে।  পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, কোচিতে তার বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২০ বি (অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র), ১৫৩এ (বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈরিতা তৈরি) ধারা এবং ইউএপিএ আইনে মামলা হয়েছে। আদালত ২৫ জুলাই পর্যন্ত তাকে কেরালা পুলিশের হেফাজতে রাখার জন্য ট্রানজিট রিমান্ড দিয়েছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে গুলশান হামলাকারীদের মধ্যে অন্তত দুইজন জাকির নায়েককে অনুসরণ করত বলে অভিযোগ ওঠার পর এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। নিহত জঙ্গিদের দুজন-রোহান ইমতিয়াজ এবং নিবরাস ইসলাম জাকির নায়েককে অনুসরণ করত বলে অভিযোগ রয়েছে। রোহান গত বছর জাকির নায়েকের পিস টিভির একটি অনুষ্ঠান তার ফেসবুক পেজে পোস্ট করেছিল। তখনই অভিযোগ পাওয়া যায় যে, ভারতে বিভিন্ন সময়ে আটক হওয়া জঙ্গিরাও জাকির নায়েককে অনুসরণ করতেন। পাটনার গান্ধী ময়দান ও বুদ্ধগয়া বিস্ফোরণে আটক জঙ্গিদের কাছ থেকেও জাকিরের বক্তৃতার সিডি ও বই উদ্ধারের দাবি করে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতে জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর দাবি ওঠে। জাকিরের বিভিন্ন বয়ানের অডিও-ভিডিও ক্লিপিংস এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার গতিবিধি খতিয়ে দেখতে ভারত সরকার ৯টি তদন্ত দল গঠন করে। অন্যদিকে বাংলাদেশেও তার পিস টিভির ডাউন লিংকের অনুমতি বাতিল করে সরকার। সূত্র:দ্য ইকোনোমিক টাইমস, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

 

আরও পড়ুন-

 

 

 /এএ/