হতাহতের সংখ্যা অনেক হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোনও নিহতের কথা জানা যায়নি। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, অন্তত ৯ জন নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন।
কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়, রবিবার ভোরে ৩-৪ ব্যক্তি উরিতে লাইন অব কন্ট্রোলের নিকটে এ সামরিক স্থাপনায় হামলায় চালায়। ভোর ৪টার দিকে হামলাকারীরা প্রশাসনিক ভবনে প্রবেশ করে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকেও বন্দুকযুদ্ধ চলছিল।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের ধারণা, হামলাকারীরা ফিদায়েন বা আত্মঘাতী স্কোয়াড হতে পারে। সেনা স্থাপনাটি বারামুল্লা জেলার শ্রীনগর-মুজাফফরাবাদ হাইওয়ের উরিতে অবস্থিত। এটা সেনাদের অস্ত্রাঘার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
হামলার পর উরির দোকানপাট সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হামলায় আহতদের আকাশপথে ৭০ কিলোমিটার দূরে শ্রীনগরে সেনা হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
সকালে একটি ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেনা দফতর থেকে কালো ধোয়া উড়তে দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, হামলাকারীরা ভেতরে আটকা পড়েছে।
বার্তা সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, হামলার পর ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সফর স্থগিত করেছেন। আজকেই তার রওনা দেওয়ার কথা ছিল। তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিবকে ঘটনাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া জরুরি একটি বৈঠকও ডেকেছেন তিনি। কথা বলেছেন জম্মু-কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী ও গভর্নরের সঙ্গে।
এর আগে চলতি বছর পাঞ্জাবে পাঠানকোট বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল জঙ্গিরা। সেখানে টানা তিনদিন বন্দুকযুদ্ধের পর সাত জঙ্গি নিহত হয়।
উল্লেখ্য, প্রায় তিন মাস ধরে কাশ্মিরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সর্বশেষ পুলিশের ছোড়া ছররা গুলিতে আহত কিশোরের মৃত্যুকে কেন্দ্র আবারও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে কাশ্মির। পুলিশের ছররা গুলিতে আহত ১৫ বছরের কিশোর মোমিন আলতাফকে শুক্রবার আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শনিবার তার মৃত্যুর পরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন শ্রীনগরের হারওয়ানের বাসিন্দারা। তার জানাজা শেষে মানুষ হারওয়ানের রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভের ফলে হারওয়ানে প্রবেশের সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। জারি করা হয় কারফিউ। বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট। এই বিক্ষোভের আঁচ যাতে অন্য এলাকায় ছড়িয় পড়তে না পারে তার জন্য শ্রীনগরের বেশ কিছু উত্তেজনাপ্রবণ এলাকায় বিশাল পুলিশবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এ কিশোরের মৃত্যুতে ৮ জুলাই থেকে টানা বিক্ষোভে এ পর্যন্ত প্রায় ৮৩ জনের মৃত্যু হলো।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় ধরনের সহিংসতা ও বিক্ষোভ চলছে কাশ্মিরে। এ ব্যাপক বিক্ষোভের শুরু হয় কমান্ডার বুরহান ওয়ানিসহ তিন হিজবুল যোদ্ধা নিহত হওয়ার পর। ৮ জুলাই কাশ্মিরের অনন্তনাগের কোকেরনাগ এলাকায় সেনা ও পুলিশের বিশেষ বাহিনীর যৌথ অভিযানে তারা নিহত হন। এর পর কাশ্মিরজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ কাশ্মিরিদের দাবি, বুরহানকে ‘ভুয়া এনকাউন্টারে’ হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে প্রথমে পুলওয়ামা ও শ্রীনগরের কিছু অঞ্চলে কারফিউ জারি করা হয়। পরবর্তীতে বিক্ষোভের মাত্রা বেড়ে গেলে কাশ্মিরের দশটি জেলা, এমনকি দূরবর্তী গ্রামেও কারফিউ জারি করা হয়। বিক্ষোভ দেখিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন মানুষ। আর বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়ে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা জারি রাখে নিরাপত্তা বাহিনী। আর তাতে প্রাণ হারায় অন্তত ৬৭ জন। টানা ৫২ দিন পর ২৯ আগস্ট শ্রীনগরের কয়েকটি এলাকা থেকে কারফিউ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়। যদিও ১৪৪ ধারা জারি থাকে।
প্রসঙ্গত, কাশ্মিরে পাকিস্তানপন্থীদের তৎপরতা থাকলেও সেখানে সরাসরি কাশ্মিরের স্বাধীনতার দাবিতে লড়াইকারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। ভারতের দাবি, কাশ্মিরে যারা লড়াই করছেন তারা আসলে জঙ্গি। বিচ্ছিন্নতাবাদী। কাশ্মির প্রশ্নে সমগ্র ভারতীয় স্টাবলিশমেন্টের দৃষ্টিভঙ্গিতেই সেখানকার সমস্যাকে ‘বিচ্ছিন্নতা আর জঙ্গিবাদের’ সমস্যা আকারে দেখা হয়ে থাকে। বিপরীতে কাশ্মিরিদের কাছে সেখানকার লড়াই আদতে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের লড়াই।
বুকারজয়ী বিখ্যাত ভারতীয় লেখক অরুন্ধতি রায় স্পষ্ট করে বলেছেন,কাশ্মিরে আসলে ভারতীয় বাহিনীর আগ্রাসন চলছে। অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে কাশ্মিরবাসীকে। কাশ্মির সমস্যার একমাত্র সমাধান স্বাধীনতা। সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এনডিটিভি।
/এএ/