অভ্যন্তরীণ জঙ্গিগোষ্ঠীর তৎপরতায় কাশ্মিরে বাড়ছে উদ্বেগ

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের স্থানীয় যুবকদের সশস্ত্র জঙ্গিবাদে জড়িত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে গত কয়েক বছর ধরে। অতীতে স্কুল থেকে ঝরে পড়া তরুণ-যুবক ও স্বল্প শিক্ষিতরা সশস্ত্র সংগঠনে জড়িত হলেও সম্প্রতি এই প্রবণতায় যোগ দিচ্ছে উচ্চ শিক্ষিতরা। এতে করে অভ্যন্তরীণভাবে গড়ে ওঠা জঙ্গিবাদ ও তাদের তৎপরতায় সেখানে উদ্বেগ বাড়ছে।

কাশ্মিরের সড়কে ভারতীয় সেনারা

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে বুরহান ওয়ানিসহ ১১ হিজবুল মুজাহিদিন সদস্যের একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এরপর অভিযান চালিয়ে ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনী একে একে ছবিতে থাকা সবাইকে হত্যা করেছে। সর্বশেষ গত রবিবার সোপিয়ানে চার সহযোগীসহ হিজবুল মুজাহিদিনের কমান্ডার সাদ্দাম পাদ্দার নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে কাশ্মির বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহকারী অধ্যাপক রাফি ভাটও ছিলেন। যিনি মাত্র ৩৬ ঘণ্টা পূর্বে হিজবুল মুজাহিদিনে যোগ দেন। ছবিতে থাকা হিজবুল কমান্ডারদের নির্মূল করা হলেও কাশ্মিরে স্থানীয় জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা আগের থেকে বেড়েছে। অনেক তরুণ এখন এসব সংগঠনে যোগ দিচ্ছেন। এ কারণে সেখানকার নীতি-নির্ধারকরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন।

সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, এই বছর কাশ্মিরের যুবকদের সশস্ত্র সংগঠনে যোগ দেওয়ার ঘটনা আরও বাড়বে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালে ৬৬ জন কাশ্মিরি তরুণ বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনে যোগ দেন। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ৮৮ জন এবং ২০১৭ সালে ১২৬ জন।

বার্তা সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, ২০১৮ সালের প্রথম ৪ মাসে ৪৫ জন তরুণ বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠিতে যোগ দিয়েছে। আরও কয়েকজনের জঙ্গি গোষ্ঠীতে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি যাচাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে পিটিআই জানায়, প্রতিটি জঙ্গির দাফনে অন্তত দুজন তরুণ জঙ্গি গোষ্ঠীতে নাম লেখাচ্ছে।

২০১৮ সালের প্রথম চার মাসেই কাশ্মিরে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর অভিযানে। সরকারে হিসাব মতে, নিহতদের মধ্যে ৫৫ জন জঙ্গি, ২০ জন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও ২৫ জন বেসামরিক লোক ছিলেন। নিহত ৫৫ জঙ্গির মধ্যে ২৭ জনই স্থানীয় বাসিন্দা। এর আগে ২০১৭ সালে ভারতীয় বাহিনীর অভিযানে ২১৮ জন জঙ্গি নিহত হয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, কাশ্মিরে সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর কেউ কেউ সরাসরি স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনরত। কেউ কেউ আবার কাশ্মিরকে পাকিস্তানের অঙ্গীভূত করার পক্ষে। ইতিহাস পরিক্রমায় ক্রমেই সেখানকার স্বাধীনতা আন্দোলনের ইসলামিকরণ হয়েছে। এখন সেখানকার বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর মধ্যে হিজবুল মুজাহিদিন সবচেয়ে সক্রিয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কাশ্মিরের জাতিমুক্তি আন্দোলনকে জঙ্গিবাদী তৎপরতা হিসেবে আখ্যায়িত করে।  

দেশীয়ভাবে গড়ে জঙ্গিবাদ ও তাতে কাশ্মিরি তরুণের যোগ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জম্মু-কাশ্মির পুলিশের মহাপরিচালক এসপি ভায়েদ বলেন, ‘অবশ্যই এটা আমাদের জন্য বড় চিন্তার কারণ। আমরা বিষয় মোকাবিলার জন্য পদক্ষেপ নেব।’

এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ব্যাপার হলো এখন শিক্ষিত তরুণরা সহিংসতার পথ বেছে নিচ্ছেন। সর্বশেষ কাশ্মির বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ রাফি ভাটের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েন। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষকের বয়স ছিল ৩২ বছর। রবিবার সোপিয়ানে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার আগে রাফি ভাট গত শুক্রবার নিখোঁজ হন।

 

অন্য শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ২৬ বছরের জুনাইদ আশরাফ খান একটি জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিয়েছেন। এমবিএ পাস করা এই তরুণ কাশ্মিরের তেহরিক-ই-হুরিয়াতের সাবেক নেতা মোহাম্মদ আশরাফ সিহরাইয়ের ছেলে।  কুপওয়ারা জেলার পিএইচডিধারী ২৬ বছর বয়সী মানান ওয়ানিও সন্ত্রাসী দলে নাম লিখিয়েছেন। সশস্ত্র সংগঠনে যোগ দিয়ে নিহত হয়েছেন রাজৌরির বাবা গুলাম শাহ বাদশাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকনোলজি বিষয়ে স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী আইসা ফাজিলি।

জম্মু ও কাশ্মিরে রক্তপাত বন্ধ করার পাশাপাশি শিশু ও তরুণদের বাঁচানোর জন্য মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি কেন্দ্রীয় সরকারে প্রতি মধ্যপন্থা খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেন। যাতে কাশ্মিরের বালকরা আর নিহত না হয় আর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মরতে না হয়।

কাশ্মিরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমার আব্দুল্লাহও তরুণ কাশ্মিরি তরুণদের সন্ত্রাসী সংগঠনে যোগ দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আব্দুল্লাহ বলেন, ‘এই মানুষগুলো শিক্ষিত ও চাকরি করছেন। গতকাল পর্যন্ত অধ্যাপক আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে প্রস্তুত করছিলেন আর এখন তিনিই এমন হতাশ হয়ে পড়লেন যে নিজেই হাতে অস্ত্র তুলে নিলেন’। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পরিস্থিতি বুঝতে হবে আসলে কী ঘটছে। কেন তিনি তার চাকরি ছেড়ে দিলেন আর সহিংসতার পথ বেছে নিলেন?’

বন্দুকযুদ্ধে শিক্ষক থেকে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া রাফি নিহত হওয়ার পর আরেক প্রতিক্রিয়ায় ওমর আব্দুল্লাহ বলেছেন, ‘যখন শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত তরুণরা সশস্ত্র বিদ্রোহের পথ বেছে নিচ্ছে, তখন এটাকে সতর্কবার্তা মনে করা যেতে পারে। সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে এ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সমাধানে রাজনৈতিক পথ খোঁজার জন্য বারবার জানানো আহ্বানের প্রতি যারা কান দিচ্ছেন না, তাদের সজাগ করার বার্তা এটি। ভয়াবহ এ পরিস্থিতির নিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকলেই বাস্তবতা পাল্টে যাবে না।’ 

ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর অভিযান ‘অপারেশন অলআউটে’ একের পর এক জঙ্গি নিহত হলেও এতে জঙ্গিবাদের বিস্তৃতি থামছে না। স্থানীয় অনেক যুবকই সশস্ত্র সংগঠনে যোগ দিচ্ছেন। ১৫ এপ্রিল ভারতের সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াতও স্বীকার করেছিলেন, সেনা বা জঙ্গিরা কেউই নিজের লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে না। তিনি বলেছিলেন, এমন সময় যা আর বেশি দূরে নয় তখন তারা বুঝতে পারবে যে সেনা বা সন্ত্রাসীদের কেউই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। শান্তির জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার এবং আমরা তাতে সফল হব।

ভারতীয় সেনাপ্রধানের এমন পর্যালোচনার কয়েকদিন পর ২৬ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মির পুলিশের সাবেক ডিজি কুলদিপ খোদা বলেছিলেন, জঙ্গিদের হত্যার ঘটনায় ২০১৮ সালে রাজ্যের পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে।