ভারতে ই-রিকশা বিপ্লব

ভারতজুড়ে ইলেক্ট্রিক যানের একটি বিপ্লব ঘটে চলেছে। এই বিপ্লবের সঙ্গে প্রাইভেট কারের কোনও যোগসূত্র নেই। দক্ষিণ সবচেয়ে বড় ও জনবহুল দেশটিতে এখন রয়েছে ১৫ লাখ ব্যাটারি চালিত থ্রি হুইলার রিকশা। এই সংখ্যাটি ২০১১ সাল থেকে চীনে বিক্রিত ইলেক্ট্রিক যাত্রীবাহী কারের তুলনায় বেশি। উভয় দেশই ব্যাটারি চালিত কার বিক্রিতে ভর্তুকি দিয়ে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ভারতের এই রিকশা বিপ্লবে রাষ্ট্রীয় অবদান একেবারেই কম। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলেও এই ত্রি হুইলারের চালকরা ভীড়, ছোট রাস্তায় ই-রিকশাকে শব্দহীন দ্রুত, পরিচ্ছন্ন ও রক্ষণাবেক্ষণে সুলভ বলে মনে করেন। এছাড়া প্রচলিত রিকশার চাইতে এগুলোতে সারাদিন প্যাডেল মারতে হয় না। ফলে সারাদিন চালানো যায়।

e-rikshaw

ভারতে প্রতি মাসে নতুন ১১ হাজার ই-রিকশা রাস্তায় নামছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠা এ.টি. কিয়ার্নির মতে, ২০২১ সালে বার্ষিক বিক্রি ৯ শতাংশ বাড়তে পারে। এখন ভারতে এই ত্রি-হুইলার বাজার প্রায় দেড়শো কোটি ডলারের। মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা ও কাইনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডসহ ছোটখাটো কোম্পানিগুলো চীন থেকে যন্ত্রাংশ কিনে এই ই-রিকশা তৈরি করছে।

উবারের মতো দিল্লিতে ই-রিকশা নিয়ে গড়ে ওঠেছে স্মার্টই নামের কোম্পানি। এতে রয়েছে ৮ শতাধিক ই-রিকশা। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী গোল্ডি শ্রিবাস্তব বলেন, এমন পরিবর্তনের সুযোগ একবারই আসে। আমরা ইলেক্ট্রিকের সুবিধা দেখি তখন আমাদের মনে  রাখা উচিত সরকার হিসেবে ভবিষ্যতের উপযোগী পণ্যকে সামনে আনা হচ্ছে কিনা?

ভারতের বৃহৎ রাইড শেয়ারিং কোম্পানি ওলা পরিকল্পনা করছে আগামী এপ্রিলের মধ্যে ১০ হাজার ই-রিকশাকে তাদের সেবার আওতায় আনার জন্য।

ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম গাড়ির বাজার। কিন্তু দেশটিতে বেসরকারি মালিকানায় ইলেক্ট্রিক কার প্রচলনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। ব্লুমবার্গের এনইএফ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে এখন ৬ হাজার ইলেক্ট্রিক কার চালু রয়েছে। চীনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাত্র তিন দিনেই এই পরিমাণ গাড়ি বিক্রি করছে।

ভারতের সবচেয়ে বড় গাড়ি নির্মাতা মারুতি সুজুকি ইন্ডিয়া লিমিটেড ২০২০ সালের আগে ইলেক্ট্রিক গাড়ি (ইভি) বিক্রি করবে না। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার এখন পরিকল্পনা করছে ইলেক্ট্রিক টু ও থ্রি হুইলার, ট্যাক্সি ও বাসে মনোযোগ দেওয়ার। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় আগামী ৫ বছরে ই-বাসের জন্য অবকাঠামো ও ভর্তুকি দিতে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে।

সরকারের নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখা এনআইটিআই আয়োগ ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী অমিতাভ কান্ট বলেন, ভারতের উচিত টু-হুইলার ও থ্রি-হুইলারকে ইলেক্ট্রিক করার দিকে মনোযোগ দেওয়া।

দিল্লির উপকণ্ঠে ট্রেন স্টেশনগুলোতে সারি সারি ই-রিকশা চোখে পড়ে। যাত্রীরাও এই বাহন পছন্দ করছেন। পর্যটক, স্কুল শিশু, ফলের বাক্স বহন করছে। মাঝে মাঝে ছাগল পরিবহন করতেও দেখা যায়।

৩২ বছরের অনিল চৌধুরী ২ বছর আগে প্রচলিত রিকশা বাদ দিয়ে ই-রিকশা চালানো শুরু করেন। তার আয় বাড়ে, এখন অবসরও বেশি। বিহারে স্ত্রী ও তিন সন্তানের জন্য টাকাও পাঠাচ্ছেন। এখন তার আরেকটি ই-রিকশা রয়েছে। তিনি বলেন, দুই মাস আগে গ্রাম থেকে আমার ভাইকে নিয়ে আসি। তাকে পুরনো ই-রিকশাটি দেই যাতে করে সে তা চালাতে পারে। আমি নতুন একটি কিনেছি।

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দশটি শহরের একটি দিল্লির পরিবেশ রক্ষায়ও ভূমিকা রাখছে এই ই-রিকশা। সোসাইটি অব ইন্ডিয়ান অটোমোবাইল ম্যানুফেকচারার্স এর মতে, মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে ৬ লাখ ৩৫ হাজার ৬৯৮টি থ্রি-হুইল গাড়ি বিক্রি হয়েছে। যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ৩৩ লাখ যাত্রীবাহী যান বিক্রি হয়েছে। যেগুলো মূলত ডিজেল বা গ্যাস দ্বারা চালিত।

ভারতে ইভি জনপ্রিয় না হওয়ার একটি বড় কারণ হচ্ছে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া ও বিনিময় করা। গত বছর দেশটিতে ৪২৫টি চার্জিং পয়েন্ট ছিল। ২০২২ সালের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ২৮০০ চার্জিং পয়েন্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে বসে নেই কোম্পানিগুলো। স্মার্টই’র মতো কোম্পানিগুলো নিজ উদ্যোগেই চার্জিং পয়েন্ট স্থাপন শুরু করতে যাচ্ছে। দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশনের সঙ্গে স্মার্টই একটি চুক্তি করেছে ১০টি স্টেশনে কাছেই ২১৪টি চার্জিং পয়েন্ট স্থাপনের। ২০২০ সালের মধ্যে এগুলো স্থাপন করা হবে।

ইলেক্ট্রিক রিকশার প্রসারের ক্ষেত্রে রিকশা চালকদের জন্য ব্যাংকের বিনিয়োগ ঘাটতি বড় একটা কারণ বলে মনে করেন শিগান ইভোল্টেম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিশির আগারওয়াল। এই কোম্পানিটি দিল্লি ও উত্তর প্রদেশে ই-রিকশা বিক্রি করে। তিনি জানান, ব্যাংকগুলো যদি রিকশা চালকদের অর্থায়নে এগিয়ে আসে তাহলে প্রতি মাসে ১ হাজার অতিরিক্ত ই-রিকশা তারা উৎপাদন করতে পারবে। বছরে বিক্রি ২০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যেতে পারে।

শিশির আগাওয়াল বলেন, যদি ভর্তুকি বাড়ে ও অর্থ প্রাপ্তির সুযোগ বাড়ে তাহলে এই বাজারকে দমিয়ে রাখা যাবে না। সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস।