ভারতে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের নেপথ্যে অপরিচ্ছন্ন অক্সিজেন সিলিন্ডার ও ভেন্টিলেটর?

ভারতে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বলে পরিচিত মিউকোরমাইকোসিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক গতিতে বাড়ছে। করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছে।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস কী?

এটি ফাঙ্গাস বা ছত্রাকসৃষ্ট রোগ। ফল, ফসল, উদ্ভিদ, প্রাণী এবং মানুষ; সবার মধ্যেই রোগটি দেখা দিতে পারে। ফল, ফসল ও উদ্ভিদের কাণ্ডে বা পাতায় কালো কিংবা গাঢ় ধূসর ভুসির আস্তরণের মতো ছত্রাকগুলো লেগে থাকে। এক ধরনের বিশেষ ছত্রাক পরিবার থেকে মানুষের শরীরে রোগটি বাসা বাঁধে। এই ছত্রাক পরিবারের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৪০। পরিবারের নাম 'মিউকোর ’। ছত্রাকসৃষ্ট রোগকে বলা হয় 'মাইকোসিস’। তাই মিউকোর ছত্রাকসৃষ্ট এ রোগের নাম 'মিউকোর-মাইকোসিস'।

এতে আক্রান্ত স্থানে কালো দাগ তৈরি হয়। আক্রান্তদের নাক থেকে শ্লেষ্মা মিশ্রিত কালো শক্ত পদার্থ বের হয়। এ কারণেই একে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা কালো ছত্রাক রোগ বলা হয়।

একজন সুস্থ মানুষ সাধারণত ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হয় না। রোগ বা কোনও বিশেষ চিকিৎসার কারণে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে মিউকোর গ্রুপের ছত্রাক কামড় বসানোর সুযোগ পায়।

শনিবার ভারত সরকার জানিয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহে ভারতে প্রায় ৯ হাজার মানুষ ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এদের বেশিরভাগ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত অথবা সুস্থ হয়েছে। সাধারণ ভারতে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২০ জনের মতো।

এটি কি সংক্রামক?

এই রোগটি সংক্রামক নয়। এর অর্থ হলো এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের সংস্পর্শে ছড়ায় না। কিন্তু ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বায়ুবাহিত রোগ। ছত্রাকের বীজগুটি বা স্পোর বাতাসে ভেসে বেড়ায়। শ্বাসগ্রহণের সময় নাসারন্ধ্র দিয়ে সাইনাস ও ফুসফুসে প্রবেশ করে। এ কারণে এ দুটি স্থান বেশি আক্রান্ত হয়।

এ ছাড়া পরিপাকতন্ত্রেও এ ছত্রাক প্রবেশ করে রোগ বাঁধাতে পারে। ত্বকে কাটা, ক্ষত বা পোড়া ঘা থাকলে সেগুলোও মিউকর ছত্রাকের প্রবেশপথ হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়া দেহের দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতার সুযোগেও ছত্রাকটি শরীরে প্রবেশ করে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশেষায়িত চক্ষু হাসপাতাল নারায়ণ নেত্রালয়ের প্রধান কে বুজাঙ্গ শেট্টি বলেন, ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস আমাদের শরীরে থাকে। কিন্তু শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিন্তু ক্যানসার, ডায়বেটিস বা স্টেরয়েড ব্যবহারের ফলে যখন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায় তখন এগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে ও গুণিতক হারে বাড়তে থাকে।

এটি কি অপরিচ্ছন্ন সিলিন্ডার ও ভেন্টিলেটর দিয়ে ছড়ায়?

এটি একেবারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিচ্ছন্ন বা নোংরা পরিস্থিতি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।

মুম্বাইয়ের হিন্দুজা হাসপাতালের চিকিৎসক নিশান্ত কুমার বলেন, অক্সিজেনের জন্য ব্যবহৃত পাইপ, সিলিন্ডার ও হিউমিডিফাইয়ারে অনেক দূষণ থাকে। কারও যদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয় এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য এসব পাইপ ও অক্সিজেন ব্যবহার করেন তাহলে এই সংক্রমণ ছড়ানোর বড় সুযোগ তৈরি হয়।

কিন্তু এটি নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে।মহারাষ্ট্রের মহাত্মা গান্ধী ইন্সটিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস-এর সিনিয়র ডাক্তার ও গবেষক এসপি কালান্ত্রি বলেন, এপ্রিলের আগেও হাসপাতালগুলো অপরিচ্ছন্ন ছিল। আমাদের এপিডেমিওলজিক্যাল গবেষণা প্রয়োজন কেন এখন ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

ঝুঁকি বাড়ায় অপরিচ্ছন্ন মাস্ক?

অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটস (এআইএমএস)-এর স্নায়ুবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক, চিকিৎসক পি শরৎ চন্দ্র সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অপরিচ্ছন্নতা ছত্রাক জাতীয় সংক্রমণের পেছনে বড় কারণ। তার ভাষায়, ‌‘অনেকেই ২ থেকে ৩ সপ্তাহের বেশি সময় না ধুয়ে একই মাস্ক ব্যবহার করেন। তার থেকেও ছড়াতে পারে এই সংক্রমণ।’

সংক্রমণ এড়াতে নিয়মিত মাস্ক পরিবর্তন বা সেটিকে সাবান দিয়ে ভাল করে ধুয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। অবশ্য তার এই কথার পিছনে এখনও যথেষ্ট পরিমাণে প্রমাণ নেই। তবে খ্যাতনামা একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক সুরেশ সিংহ নারুকা পিটিআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই ছত্রাকের সংক্রমণের পেছনে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের বড় ভূমিকা থাকতেই পারে।

সুরেশ সিংহ নারুকা বলেন, ‘এক মাস্ক পরা তো বটেই, তার পাশাপাশি হাওয়া চলাচল করে না এমন ঘরে বসবাসও ব্ল্যাক ফাঙ্গাস সংক্রমণের পেছনে বড় কারণ হতে পারে।’ তবে এর পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত স্টেরয়েডের ব্যবহারকেও তিনি অনেকাংশে দায়ী করেছেন। সূত্র: আল জাজিরা, আনন্দবাজার পত্রিকা অনলাইন।