‘বিজেমূল’ তত্ত্ব বুমেরাং, আলিমুদ্দিনকে দুষছে জেলা সিপিএম

পশ্চিমবঙ্গের ২০২১ সালের বিধানসভার ভোট প্রচারে তৃণমূল-বিজেপিকে এক আসনে বসিয়ে ‘বিজেমূল’ তত্ত্ব বুমেরাং হয়েছে বামেদের। রাজ্যের জনগণ বিজেপি আর তৃণমূলকে সমান বিপদ বলে মনে করেননি। বিজেপিকে ঠেকাতে তারা তৃণমূলকেই অনেক নির্ভরযোগ্য বলেই মনে করেছেন। কিন্তু বিজেমূল তত্ত্বে বামদের অবশিষ্ট ভোট ব্যাংকও চলে গিয়েছে তৃণমূলের দিকে। একুশের হারের ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে এখন আলিমুদ্দিনকে দুষছে সিপিএমের জেলা কমিটিগুলো। শনিবার সিপিএমের রাজ্য কমিটির প্রথম ভার্চুয়াল বৈঠকে জেলা নেতৃত্ব ভোট বিপর্যয়ের জন্য সব দায়ভার চাপিয়ে দিয়েছেন রাজ্য কমিটির ঘাড়ে। রাজ্যের নেতৃত্বের একাংশও শীর্ষ নেতৃত্বকে দায়ী করে আইএসএফের সঙ্গে জোটকেই বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে তুলে ধরেন। কিন্তু রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্ব তা মানতে নারাজ। এমনটাই সূত্রের খবর।

সূত্রের খবর, গত শনিবার একুশের ভয়াবহ হারের পর সিপিএমের প্রথম রাজ্য কমিটির বৈঠক প্রথম থেকেই ছিল উত্তাল। জেলা কমিটিগুলো থেকে আলিমুদ্দিনের কর্মকর্তাদের ওপর একের পর এক অভিযোগের তীর বর্ষিত হয়। নিশানা করা হয় প্রবীন বিমান বসু, সুর্যকান্ত মিশ্র থেকে মহম্মদ সেলিমকে। বিজেপিকে ঠেকাতে আর তৃণমূলে মুসলিম ভোট ব্যাংক ভাঙতে পিরজাদা আব্বাসের সঙ্গে জোটের বিষয়টি জেলা নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি কেন তা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন শীর্ষ নেতারা। এই জোট গঠনে একতরফা সিদ্ধান্ত যারা নিয়েছিলেন এখন এই ভয়াবহ ফলাফলের দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে বলে সোচ্চার হন সিপিএমের একাধিক জেলা নেতা। একাধিক নেতা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘দলের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিতে আঘাত করেছে এই জোটের সিদ্ধান্ত।’ 

কিন্তু শত বিরোধীতার পরও এই জোট ভাঙতে নারাজ সিপিএমের শীর্ষনেতারা। এদিনের বৈঠকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, সিপিএম আইএসএফের হাত ধরেই চলবে। তবে যদি কোনও শরিক মনে করে তারা আইএসএফের সঙ্গে চলতে চায় না, তবে তারা তাদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এদিকে এদিন আব্বাসের সঙ্গে জোট নিয়ে  প্রকাশ্যে সরব হওয়া সিপিএমের উত্তর দমদম বিধানসভার পরাজিত প্রার্থী তন্ময় ভট্টাচার্যকে সেন্সর করা হয়েছে। তিনি বামেদের এই শোচনীয় পরাজয়ের জন্য ঘুরিয়ে এই জোটকেই দায়ী করেছিলেন।

জানা গেছে, একুশের হারের ময়নাতদন্ত নিয়ে একটি প্রশ্নপত্র জেলাগুলোতে পাঠিয়েছিল আলিমুদ্দিন। সেখানে একটি প্রশ্নে  বিজেমূল তত্ত্ব নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তৃণমূল-বিজেপির বোঝাপড়ার রাজনীতি সম্পর্কে জনগণ কি সিপিএম তথা বামেদের প্রচার গ্রহণ করেনি? এর উত্তরে একাধিক জেলা কমিটি শীর্ষ নেতাদের কটাক্ষ করে পালটা প্রশ্ন তুলে বলেছেন, এই তত্ত্ব আলিমুদ্দিনের ঠান্ডা ঘরে বসে তৈরি হয়েছিল। এটা কি বাস্তবসম্মত ছিল? 

সিপিএমের দক্ষিণ ২৪ পরগণার এক জেলা নেতা বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারিনি। এবার মানুষ ভোট দিয়েছেন বিজেপিকে ঠেকাতে। তৃণমূল থেকে বিজেপিতে বেশ কয়েকজন বিধায়ক গেলেন বলে আমরা, তৃণমূল আর বিজেপিকে এক করে ফেললাম। বিজেমূল তত্ত্ব প্রচার করতে শুরু করলাম। বাম থেকেও তো নেতারা গিয়েছেন তা নিয়ে তো আমরা কিছু বলেনি। আসলে আমাদের বিজেপি বিরোধীতা মানুষ বিশ্বাস করেননি। মমতা শুধু বিজেপিকেই টার্গেট করে এগিয়েছিলেন। আর তার ফল তৃণমূল পেয়েছে। নিচুতলার একটা বড় অংশে বামপন্থীরা মনে করেছেন, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ঠেকাতে পারবেন মমতা। আমরা নয়, তাই আমরা নিশ্চিহ্ন হয়েছি।’

সূত্রের আরও খবর, এদিন আলিমুদ্দিনের পক্ষ থেকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে, ভোটের সময় অতিরিক্ত তৃণমূল বিরোধীতাও ঠিক হয়নি। সিপিএমের রাজ্য কমিটির সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বৈঠকে বলেছেন, ‘আমরা অতিরিক্ত তৃণমূল বিরোধিতা করতে গিয়ে রাজ্য সরকারের জনমুখী প্রকল্পের বিরোধিতাও করে ফেলেছি। তাই মানুষ আমাদের নেয়নি। তৃণমূল সরকারের জনমুখী প্রকল্পের বিরোধিতা পুরোটাই পার্টির বিরুদ্ধে গিয়েছে। এ থেকে এবার শিক্ষা নিতে চাইছে সিপিএম।’

আলিমুদ্দিনের এই মূল্যায়ন নিয়ে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তাহলে কি এবার বামেরা তৃণমূলের প্রতি নরম মনোভাব নিয়ে এগোবে? সিপিএম কট্টর তৃণমূল বিরোধীতা থেকে সরে এসে পশ্চিমবঙ্গের বাম রাজনীতিতে কোন নতুন পথের সন্ধান করে, ফের প্রাসঙ্গিক হতে চাইছে? এসব প্রশ্নের জবাব পাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হবে আরও কিছুদিন।