দেবাঞ্জনের প্রতারণা জালে চাকরি প্রার্থী থেকে প্রমোটররাও

চাকরি দেওয়া থেকে শুরু করে ভবনের প্ল্যান পাস করিয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা, প্রায় সবকিছুতে সিদ্ধহস্ত ছিল কলকাতার কসবার ভুয়া টিকা কাণ্ডের মূল অভিযুক্ত দেবাঞ্জন দেব। স্কুল জীবন থেকেই পরিবার ও বন্ধুদের কাছে নিজের প্রতিভার কথা তুলে ধরতে একাধিক মিথ্যার আশ্রয় নিত দেবাঞ্জন। এই মিথ্যার মধ্য দিয়ে একটা সময় প্রতারকের জীবনে পা দেয় সে। এমনটাই বলছেন তার স্কুলজীবনের বন্ধুরা। শুধু তাই নয়, ছেলে যে আইএএস কর্মকর্তা নন, তা জেনেও চুপ করেছিলেন দেবাঞ্জনের বাবা-মা। পুলিশি তদন্তে প্রতিদিনই উঠে আসছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য।

জানা গেছে, শুধু কলকাতা পৌরসভায় চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা নয়, ২০২০ সালে বিধাননগরের ইলেক্ট্রনিক কমপ্লেক্স থানায় দেবাঞ্জনের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা অভিযোগ হয়েছিল। সেই সময় তাকে জেরাও করা হয় পুলিশের তরফ থেকে।

অন্যদিকে, সোমবার তিন প্রতারিত প্রমোটারকে লালবাজারে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্তকারীরা। এই তিনজনের থেকে ৪০ লাখ, ৩০ লাখ ও ২৬ লাখ রুপি হাতিয়ে নেয় সে। অবৈধ নির্মাণকে বৈধ করতে নাকি নিজের ভুয়া আইএএস পরিচয়ে হুমকি দিয়ে টাকা আদায় করেছিল দেবাঞ্জন তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। পাশাপাশি দুই ব্যাংক কর্মকর্তাকেও তলব করে লালবাজার। কীভাবে পৌরসভা নামে সরকারি সংস্থার নামে অ্যাকউন্ট খোলা হলো তা জানতে চাওয়া হয় তাদের কাছে। এমনটাই সূত্রের খবর।

ভুয়া টিকা, ভুয়া নথির পর এবার ভুয়া স্যালারি স্লিপ তৈরিরও অভিযোগ উঠল দেবাঞ্জনের নামে। এই ভুয়া স্লিপ দেখিয়ে একটি বেসরকারি ব্যাংকের গোলপার্কের শাখা থেকে চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ২০ লাখ রুপি লোন নিয়েছিল দেবাঞ্জন, এমনটাই সূত্রের খবর। জানা গেছে, রাজ্য সরকারের যুগ্ম সচিব পদমর্যদার কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামোর হারে স্যালারি স্লিপ তৈরি করে নিজের বেতন দেখিয়েছিল মাসিক ৭৭ হাজার রুপি। ৪০ হাজার রুপির মাসিক কিস্তিতে এই লোন নিয়েছিল দেবাঞ্জন।

এই ব্যাংকের তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, দেবাঞ্জন নীল বাতি লাগানো গাড়িতে ব্যাংকে আসত। সঙ্গে ছিলেন দেহরক্ষীও। ব্যাংকে নিজের পরিচয় দেন রাজ্য সরকারের যুগ্ম সচিব হিসেবে। লোন নেওয়ার জন্য নিজের স্যালারি স্লিপসহ যাবতীয় কাগজপত্র দেখান। স্বপ্লভাষী দেবাঞ্জনের আদব-কায়দা বিন্দুমাত্র সন্দেহ উদ্রেক করেনি ব্যাংকের কর্তাদের। তাই তার দেওয়া কোনও নথি যাচাই করেনি ব্যাংক। এই লোনের চারটে কিস্তি এখন পর্যন্ত শোধ করেছে দেবাঞ্জন।

সূত্রের খবর, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে অশোক রায় নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে মাসিক ৬৫ হাজার রুপিতে কসবার অফিসটি ভাড়া নিয়েছিল দেবাঞ্জন। ওই সময় সেপ্টেম্বর মাসেই ইন্টারনেটে একটি ডোমেন কেনে সে। পৌরসভার ভুয়ো ইমেইল আইডি খুলতেই ডোমেন কেনার কথা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে দেবাঞ্জন। গতবছর নভেম্বর মাসে ডেপুটি ম্যানেজার অ্যাট দ্যা রেট কেএমসিগভ ডট ওআরজি নামে মেইল আইডি তৈরি করা হয়। এই ভুয়া আইডি তৈরি করা হয় বিভিন্ন ব্যবসায়ী এবং প্রতিষ্ঠানগুলির কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করার জন্য। রবিবার রাতে দেবাঞ্জনের মাদুরদহের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছিল পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, সেখান থেকে বেশ কিছু নথি ও স্ট্যাম্প পেপার উদ্ধার হয়েছে। বাড়ির চারদিকে যে সিসি ক্যামেরা লাগানো ছিল, তার ফুটেজও খতিয়ে দেখবে পুলিশ। বাড়িতে কারা আসত তাও খতিয়ে দেখবেন গোয়েন্দরা।

এদিকে, দেবাঞ্জনের প্রতারণার জীবন শুরু স্কুলের পড়ার সময় থেকে। এমনটাই দাবি করেছেন তার স্কুল জীবনের বন্ধু অরিজিৎ মণ্ডল। তিনি সাফ জানিয়েছেন, ‘আমার দ্বাদশ শ্রেণিতে অংকের কোচিংয়ে পরিচয় হয় দেবাঞ্জনের সঙ্গে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই লাগাতার মিথ্যে বলত দেবাঞ্জন। সেগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করতে নানা প্রমাণও পেশ করত সে।  প্রথমে আমাকে দেবাঞ্জন জানায়, সে সংগীত পরিচালক জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সহযোগী। এর পর জানায় সে শ্রীজিত মুখোপাধ্যায়ের সহকারী হিসেবে কাজ করছে। এর মধ্যে একবার সে দাবি করে, কান চলচ্চিত্র উৎসবে তার বানানো তথ্যচিত্র দেখানো হয়েছে। বেশ কয়েকটি পুরস্কারও জিতেছে সে। সেজন্য বাড়িতে পার্টি দেয় দেবাঞ্জন। সেখানে পুরস্কারের স্মারক দেখায়। তাতে কান চলচ্চিত্র উৎসব ও বিভাগের নাম স্পষ্ট লেখা ছিল। এর মধ্যে সে দাবি করে তার বানানো প্রজেক্ট জাতীয় স্তরে দ্বিতীয় হয়েছে। সেজন্য রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পুরস্কার পাবে সে।’

রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরে কাজ করে দেবাঞ্জন এমনটাই জানিয়েছিল বলে অরিজিৎ বলেন, ‘অর্থ রোজগারের আশায় নয়, গুরুত্ব পাওয়ার নেশা থেকেই মিথ্যা বলত দেবাঞ্জন। সব আলোচনায় মধ্যমণি হতে চাইত সে। কোথাও কেউ ওকে গুরুত্ব কম দিলে রেগে যেত।’