পশ্চিমবঙ্গে সংক্রমণ বাড়লেও উধাও করোনাবিধি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে করোনা সংক্রমণ। ইতোমধ্যেই কোথাও লকডাউন, কোথাও কনটেইনমেন্ট জোন ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। অন্যদিকে কোভিডের তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কাকে পাত্তা না দিয়ে পর্যটনের ঢল নেমেছে সমতলের গ্রামীণ ও পাহাড়ি এলাকাগুলোতে।

শহরে তো বটেই, প্রতিদিনই নতুন করে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে পাহাড়েও। তা সত্ত্বেও লোকজন এখনও করোনাবিধি গ্রাহ্য না করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শহরের জনপ্রিয় টুরিস্ট স্পট, পার্ক সর্বত্রই এক চিত্র। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা তো পরের কথা, এমনকি মাস্কও নেই অধিকাংশ মানুষের মুখে।

স্বাস্থ্য দফতরের রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধু দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, তা নয়। গত কয়েক দিন ধরে মৃতের সংখ্যাও দৈনিক ১০-এর ওপর থাকছে। বুধবার দফতরের বুলেটিনে বলা হয়েছে, রাজ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৯৭৬ জনের কোভিড শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১৫ জনের। কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা-সহ কয়েকটি জেলায় বাড়ছে সংক্রমণ। এই বুলেটিন অনুযায়ী কলকাতায় ২৭২, উত্তর ২৪ পরগনায় ১৫৯ জন আক্রান্ত।

এরইমধ্যে ট্যুরিজম নিয়ে সতর্ক করেছে আইসিএমআর। দীর্ঘদিন কোভিডের জেরে ঘরে বন্দি থাকা মানুষ নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতেই বেরিয়ে পড়েছে। ভিড় দেখা যাচ্ছে পর্যটনস্থলে। এতেই উদ্বিগ্ন আইসিএমআর। সম্প্রতি একটি জার্নালে প্রকাশিত কাউন্সিলের রিপোর্টে বলা হয়েছে, পর্যটন বেড়ে যাওয়ার ফলে কোভিডের তৃতীয় ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে। একই ছবি বিভিন্ন শহরে থাকা বিনোদন পার্কেও। সেখানেও মানুষের ঢল দেখা যাচ্ছে। পর্যটকের ভিড়ে টাইটম্বুর মিলেনিয়াম পার্ক, প্রিন্সেপ ঘাট থেকে নিউটাউন ইকো পার্ক, ভিক্টোরিয়া চত্বর। কোথাও বালাই নেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বা মাস্ক পরার। ইকো পার্ক চত্বরে এলে বোঝার উপায় নেই, এই শহরে সাম্প্রতিক অতীতে কোভিডের প্রকোপে হাসপাতালের শয্যা থেকে অক্সিজেনের হাহাকার দেখা গিয়েছিল। দলবদ্ধ হয়ে ছবি তোলার প্রবণতায় শিশু থেকে বৃদ্ধ ৯০ শতাংশের বেশি মানুষের মুখে মাস্ক থাকছে না। এমনকি কোনও কড়াকড়ি নেই। খোদ নিরাপত্তারক্ষী কিংবা টিকিট কাউন্টারের কর্মীও মাস্ক পরেননি। তাহলে টোটোচালক বা চলমান চা বিক্রেতা থেকে সাধারণ দোকানি, তারা মাস্ক পরবেন কেন!

ইকো পার্কে ঘুরতে আসা বেহালার স্বপ্না সাউয়ের মুখে মাস্ক ছিল না। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর বেড়াতে বেরিয়েছি। ঘরে একটানা থাকতে ভালো লাগছিল না। এখন তো করোনা নেই, তাই মাস্ক পরিনি।’

এই প্রবণতা মারাত্মক হিসেবে দেখা দিতে পারে। আইসিএমআর গাণিতিক মডেল অনুসরণ করে বলেছে, কোনও একটি জায়গায় হঠাৎ জনঘনত্ব বেড়ে গেলে সংক্রমণের আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাতেই এগিয়ে আসতে পারে তৃতীয় ঢেউ। তার ওপর যদি মাস্ক ব্যবহার বা সামাজিক দূরত্ব পালনের ক্ষেত্রে অবহেলা দেখা যায়, তার ফল মারাত্মক হতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সুবর্ণ গোস্বামী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘অনেক মানুষের টিকা দেওয়া হয়ে গেছে। ফলে তারা করোনায় আক্রান্ত হলেও অ্যাসিম্পটোমেটিক থাকছেন। মৃদু উপসর্গ বুঝতে পেরেও তারা যথেচ্ছ ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এতে কোভিড আরও ছড়াচ্ছে। তার মধ্যে অনেকেই ঠিকঠাক মাস্ক পরছেন না। এতে যাদের টিকা নেওয়া হয়নি, তারা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।’

অর্থনীতিকে চাঙা করে তোলার জন্যই কোভিড নিয়ন্ত্রণবিধি দেশজুড়ে শিথিল করে পর্যটন শিল্পকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার আবার পর্যটন ভিসা দেওয়া শুরু করার কথা জানিয়েছে। এমনকি একটি টিকার ডোজ থাকলেও দিঘা সফর করতে পারবেন বলে জানিয়েছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা প্রশাসন। হোটেল বা রিসোর্টগুলোতে পর্যটকদের সাবধানতা অবলম্বন করার কথা বলা হলেও সেটা কি মানা হচ্ছে?

হোটেল মালিকরা জানান, টিকা নেওয়ার সনদ জমা দিয়ে পর্যটকেরা আসছেন বটে, কিন্তু তারা মাস্ক পরছেন না বা দূরত্ববিধি মানছেন না। এই গাফিলতি রোখার উপায় নেই?

ডা. সুবর্ণ গোস্বামী বলেন, ‘পুজোর আগে থেকেই এই বেরুনোর হিড়িক শুরু হয়েছে। এপিডেমিক অ্যাক্ট, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট চালু আছে। কিন্তু প্রশাসন চোখ বন্ধ করে আছে। সবটা সচেতনতা দিয়ে হয় না। আইন বলবৎ করার দিকে প্রশাসন গাফিলতি দেখাচ্ছে।’ সূত্র: ডিডাব্লিউ।