বিক্ষিপ্ত অশান্তির মধ্যেই শেষ হলো পশ্চিমবঙ্গের চার পৌর নিগমের ভোটগ্রহণ। শনিবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত চার পৌর নিগমে ভোট পড়েছে ৭২ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে শিলিগুড়িতে ৭৩.৬০ শতাংশ। চন্দননগরে পড়েছে ৭০.৭৬ শতাংশ। বিধান নগরে ৭১.০৯ শতাংশ আর আসানসোলে ৭১.৮৭ শতাংশ। এদিন সকাল থেকেই অশান্তির জন্য শিরোনামে এসেছে বিধান নগর এবং আসানসোল।
বেলা বাড়ার পর এই দুই পৌর এলাকায় ভোটের উত্তাপ বাড়ে। বিধাননগরের ৪১টি, চন্দননগরের ৩২টি, শিলিগুড়ির ৪৭টি এবং আসানসোলের ১০৬টি ওয়ার্ডের বাসিন্দারা নিজেদের কাউন্সিলর বেছে নিতে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেন। বেলা বাড়লে উত্তেজনা বাড়ে আসানসোলে।
জামুরিয়ার শ্রীপুর হাই স্কুলে চলেছে গুলি। দুই দুষ্কৃতীর বিরুদ্ধে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে। সবাই তৃণমূল আশ্রিত, অভিযোগ সিপিএমের। আসানসোলের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে বিজেপি প্রার্থীর মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় কাঠগড়ায় স্থানীয় তৃণমূল প্রার্থী। ভোট গ্রহণের শেষ বেলায় আসানসোলের ৫১ নম্বর ওয়ার্ডে বুথ লুটের অভিযোগ তুলেছে বিজেপি। দলীয় এজেন্টের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ভোট লুট হয়েছে। এমনটাই অভিযোগ গেরুয়া শিবিরের।
এদিন অশান্ত ছিল বিধাননগরও। সবচেয়ে বেশি অশান্তির খবর বিধান নগরের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে। চন্দন নগরে এসডিও অফিসের সামনে অবস্থানে বসেছে বিজেপি। ভোট লুট এবং বিজেপি কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগে এই অবস্থান কর্মসূচি পালন করে তারা। আসানসোলে ২১ নম্বর ওয়ার্ডে বোমাবাজির অভিযোগ উঠেছে। আট রাউন্ড গুলি চালিয়েছে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা। এমনটাই অভিযোগ।
এদিকে, বিজেপি প্রার্থীকে মারধরের ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছে তিন জন। ছাপ্পা ভোট আটকাতে গিয়ে তৃণমূলের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন বিজেপি কর্মী। এমনটাই অভিযোগ। একইভাবে সল্টলেকে এএ ব্লকে বহিরাগত জমায়েতের অভিযোগ তোলেন বিজেপি প্রার্থী। বিধান নগরের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে ভোট কেন্দ্রের বাইরে দেখা মেলে ভুয়া ভোটারের। পরে তারা আশ্রয় নেয় বুথের বাথরুমে। সেখান থেকে সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা দেখে দৌড়ে পালায় তারা।
আসানসোলে ভোট শুরু হতেই বাধে বিপত্তি। হাতিয়ারায় ছাপ্পা ভোটের অভিযোগে প্রতিবাদ করে স্থানীয়রা। হাতিয়ারা হাই মাদ্রাসা স্কুলে 'ছাপ্পা' ভোটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শনিবার সকালে সময়ের আগে মকপোল করিয়ে নেওয়া হয়েছে, একইসঙ্গে খোলা হয়েছে সিল। এমন অভিযোগে প্রতিবাদ জানায় তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী কাঞ্চন তেওয়ারির এজেন্টরা। ডেকে পাঠানো হয় সেক্টর অফিসারকে। প্রায় ১৫ মিনিট পর শুরু হয় ভোট। রানীগঞ্জ গার্লস কলেজের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের আট নম্বর বুথের ঘটনা। আসানসোল দক্ষিণের বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পলের বাড়ির সামনে ছিল বিশাল পুলিশ বাহিনী।
পুলিশের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের নোটিশ ধরানোর চেষ্টা করা হয়। ওয়ার্ডের বাইরে বেরুতে পারবেন না বলে ওই নোটিশে উল্লেখ ছিল। অভিযোগ, তার নিরাপত্তারক্ষী অর্থাৎ কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের নিয়ে চলাফেরায় বাধা দিচ্ছে পুলিশ। তবে নোটিশ নেননি অগ্নিমিত্রা পল।
বিধাননগর পৌর নিগমের বাগুইআটি সংলগ্ন দশদ্রোণ অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জমায়েত, ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ। সিপিএম প্রার্থীর এজেন্টকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ। পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডে দশদ্রোণ অবৈতনিক বিদ্যালয়ের ঘটনা। অভিযোগ শাসক দলের বিরুদ্ধে।
বিধাননগর পৌর নিগমের ২৬ নং ওয়ার্ডের বিরোধীদের বিস্তর অভিযোগ। বিজেপি প্রার্থী সাধনা ঢালির বাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ। রাতের অন্ধকারে তার বাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ শাসক দলের বিরুদ্ধে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাসক দলের প্রার্থী সুশোভন মণ্ডল। তার দাবি, বিজেপির গোষ্ঠী কোন্দলের জেরে এই ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে ওই ওয়ার্ডের সিপিএম প্রার্থী গৌরী নন্দীর অভিযোগ তার এজেন্টকে বসতে দেওয়া হয়নি। তবে এদিন সকাল থেকে তার ওপর কোনও আক্রমণ হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
সল্টলেকে দিনের শুরুতেই ভুয়া ভোটারদের আনাগোনার অভিযোগ। তাড়া করে ভুয়া ভোটার ধরেন ৩১ নং ওয়ার্ডের বিজেপি প্রার্থী। শিলিগুড়িতেও একই চিত্র। কড়া নিরাপত্তায় চলেছে ভোটগ্রহণ। শিলিগুড়ি পৌর এলাকার ছয় নম্বর ওয়ার্ডে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ গার্লস হাই স্কুলে ভোটগ্রহণ হয়। এই ওয়ার্ডে এবারের হেভিওয়েট প্রার্থী অশোক ভট্টাচার্য। বিগত পৌর বোর্ডের মেয়র ছিলেন তিনি। করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় কড়া ব্যবস্থা নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে মাস্ক। এছাড়াও কেন্দ্রে ঢুকতেই ভোটারদের হাতে দেওয়া হচ্ছে স্যানিটাইজারসহ গ্লাভস। নিরাপত্তার স্বার্থে থার্মাল গানের সাহায্যে তাপমাত্রা দেখা হয়েছে ভোটারদের।
এদিকে চার পৌর নিগমের ভোটকে গণতন্ত্রের সমাধি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সুকান্ত মজুমদার। শনিবার রাজ্য বিজেপি দফতরে সাংবাদিক বৈঠক করে দলের রাজ্য সভাপতি একইসঙ্গে আদালতে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলেন। রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে তৃণমূলের মদতপুষ্ট বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, 'কমিশনের কাছে গিয়ে কিছু লাভ নেই। যা বলার আদালতে বলবো।'
এদিন রাজ্য দফতরে তিনি অভিযোগ করেন আসানসোল, বিধাননগর, চন্দননগরে একাধিক অশান্তির ঘটনা ঘটেছে। বালুরঘাটের সাংসদ বলেন, 'এটা ভোট পরবর্তী সন্ত্রাসের সম্প্রসারিত রূপ। গণতন্ত্রের নামে প্রহসন হয়েছে। বিধাননগরে ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে আমাদের নারী প্রার্থীর শ্লীলতাহানি হয়েছে। ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের আমাদের প্রার্থী বুথে বহিরাগত ধরতে গিয়ে হেনস্থার শিকার হন। আসানসোলে ৪২ নম্বর ওয়ার্ডের বিজেপি প্রার্থী ও তার ছেলেকে বন্দুক দেখিয়ে অপহরণ করা হয়েছে। অগ্নিমিত্রা পলকে বাড়ি থেকে বেরুতে দেওয়া হয়নি।'
সুকান্তের কটাক্ষ, রাজ্য সরকার এভাবে ভোট করার চেয়ে যদি ভোট না করাতেন, প্রশাসক বসিয়ে রাখতেন, তাহলে অনেক ভালো হতো। বোমা, গুলি, কারও মাথা ফাটা, এসবের কোনও প্রয়োজন ছিল না।'
সুকান্ত মজুমদার বলেন, 'বিজেপির ওপর যেমন হামলা হয়েছে, তেমনি অন্য বিরোধী দলের ওপর হামলা হয়েছে কিছু কিছু জায়গায়। বিজেপি যেহেতু মূল প্রতিপক্ষ, তাই সমস্ত হামলা, বুথ লুট, ভোট লুট বিজেপির বিরুদ্ধে বেশি করা হয়েছে।' তবে শিলিগুড়ির ব্যাপারে আশাবাদী সুকান্ত। তিনি বলেন, 'শিলিগুড়িতে ভালো ফল করবে বিজেপি।' বোর্ড গড়তে পারবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আমি জ্যোতিষী নই, তবে শিলিগুড়িতে বিজেপি ফল ভালো করবে।'
স্রেফ পৌর ভোটে অশান্তিই নয়, রাজ্যে সার্বিক আইনশৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগও করেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি। শওকত মোল্লার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, 'রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার এই অবনতির কথাই শুধু বলছি না, আমাদের হাতে চিঠি এসেছে। যার নাম শুনলে নাকি সুন্দরবনে নাকি বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়, সেই শওকত নিজের প্যাডে পুলিশকে জানাচ্ছেন, তার প্রাণনাশের আশঙ্কা আছে। অভিযোগপত্রটি পেয়েছি। সত্যি না মিথ্যা, সেটা সময় বলবে।'