ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির স্বপ্ন দেখছে বামেরা। বাম আমলে এক যুবক রিজাওনুর হত্যার মধ্য দিয়ে উত্তাল হয়েছিল কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গ। তার হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন বুদ্ধিজীবী থেকে সাধারণ মানুষ। সেদিনের আন্দোলনের রেশ ধরেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে জায়গা নেওয়া শুরু করেছিল তৃণমূল। আজ ঠিক একইভাবে আনিসের হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল হচ্ছে রাজ্য। রাজনীতির বাধ্যবাধকতার কারণে মাঠে নেই প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে শূন্য হয়ে যাওয়া বামেরা; মুলত সিপিএম ঝাঁপিয়ে পড়েছে আনিস হত্যার আন্দোলনে। ফের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফিরে আসার এই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন আলিমুদ্দিনের কর্তারা।
২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে উঠতে শুরু করে বিজেপি। ‘তৃণমূল-বিজেপি একই শক্তি’- এই স্লোগান দিয়ে বামেরা আরও কোনঠাসা হয়ে পড়ে। ২০২১-এর বিধানসভায় জোটের পরাজয় শুধু ঘটেনি, পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে এই প্রথম কোনও বাম বিধায়ক বিধানসভা যেতে পারেননি। পরের উপনির্বাচনগুলো থেকে বামফ্রন্টে তীব্র দ্বন্ধের কারণে কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে ফের ‘একলা চলো রে’ নীতিতে ফিরে আসা তারা। দেখা গেছে, তাদের ভোট শতাংশ সামান্য হলেও বেড়েছে। এরপর পৌরনিগমের ভোটেও আশার আলো দেখছে বাম শিবির। কারণ শতাংশের বিচারে গেরুয়া শিবিরে গ্রাফ যখন নিম্নমুখী তখন ঊর্ধ্বমুখী বামেদের প্রাপ্ত ভোট শতাংশ। আর তাতেই বামেদের কামব্যাকের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন আলিমুদ্দিনের শীর্ষ নেতারা। এরই মধ্যে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা আনিস খানের হত্যা বামেদেরকে ফের আন্দোলনমুখী করে তুলেছে। একদা সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের সদস্য আনিস নানা দল ঘুরে আইএসএফের সদস্য ছিলেন বলেই খবর। সোশাল মিডিয়ায় তৃণমূল ও বিজেপি বিরোধী মন্তব্য শুধু নয়, এনআরসি ও সিএএ আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন আনিস। জানা গেছে, একসময় বামেদের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এসএফআই ছাড়েন আনিস। তার মৃত্যুর পর বামেদের ছাত্রসংগঠনগুলোর কাছে এখন সরকারবিরোধী আইকন হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু ভোটকে তৃণমূলের হাত থেকে ফের বামেদের কাছে ফিরিয়ে আনতেই ‘আনিস সেন্টিমেন্ট’কে কাজে লাগতে চাইছে সিপিএম। বামেদের ভোট বৃদ্ধির মানে বিজেপির অবস্থান ক্রমাগত নড়বড়ে হয়ে যাওয়া। পশ্চিমবঙ্গের ১০৮ পৌরসভায় সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে আনিস হত্যার প্রভাব পড়বে এটা ধরে নিয়ে বামেরা সর্বাত্মক আন্দোলনে নেমেছে। এমনিতেই সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে বামেদের ভোটের গ্রাফ ঊর্ধগামী। সেখানে সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংক যুক্ত হলে তা নিঃসন্দেহে তৃণমূল ও বিজেপিকে চাপে ফেলবে। এই অঙ্কটা ভালোই বোঝেন চৌত্রিশ বছর রাজ্যে সরকার চালানো আলিমুদ্দিনের কর্তারা।
হিন্দুভোট বিজেপির হাত থেকে অনেকটাই বেরিয়ে তৃণমূলের কাছে চলে গেছে – রাজ্যে তা সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট। এমতাবস্থায় বিজেপির প্রধান বিরোধী দলের তকমা থাকাটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন। আনিস হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিজেপি বিবৃতি দেওয়া ছাড়া আর সেভাবে মাঠে নেই। বামদের অভিযোগ, এনআরসি ও সিএএ বিরোধীতা শুধু সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট দেওয়া নয়, এ নিয়ে আন্দোলনের মুখ ছিলেন আনিস। তাই বিজেপি তাকে নিয়ে আন্দোলনে নেই।
বিজেপির মাঠে না থাকার কারণ শমীক ভট্টাচার্যর কথায় স্পষ্ট হয়। তিনি বলেছেন, ‘সোশাল মিডিয়ায় আনিস যে ভারতবিরোধী কথাবার্তা লিখে পোস্ট করত– আমরা সেগুলোর ঘোরতর বিরোধী। যেকোনও অবস্থাতেই বিজেপি এই মতকে সমর্থন করে না, আর কোনোদিন করবেও না। তবে তার কারণে একটা ছাত্রকে খুন হতে হবে, এটা আমরা মোটেই চাই না।’
তারা মনে করছেন গোটা ঘটনায় নিয়ে রাজনীতিকরণ চলছে। বিষয়টি নিয়ে এবিভিপির দক্ষিণবঙ্গ প্রান্ত সম্পাদক সঙ্গীত ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা ছাত্র হত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। দোষীরা শাস্তি পাক। কিন্তু সেই সঙ্গে আমাদের প্রশ্ন এই সরকারের আমলে দাঁড়িভিটের রাজেশ, তাপসের হত্যার সময় বুদ্ধিজীবীরা কেন পথে নামেননি? সেদিন কেন বামপন্থীরা আজকের মতো প্রতিবাদ করেননি। ছাত্র মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি কেন?’
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, আর্দশগত কারণেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে অলআউট আন্দোলনের পরিস্থিতির সুযোগ পেয়ে কাজে লাগতে পারছে না বিজেপি। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফিকে হয়ে যাওয়া বামেরা ফের বিরোধী রাজনীতির একমাত্র দাবীদার হওয়ার চেষ্টায় সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।