ভারতে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একাধিকবার তৈরি হয়েছে হিন্দি ভাষাকে নিয়ে বিতর্ক। হিন্দিকেই ভারতের প্রধান ভাষা হিসাবে ব্যবহার করার জন্য মুরলী মনোহর যোশীর সময় থেকেই বহুবার সওয়াল করেছেন বিজেপির একাধিক নেতা ও মন্ত্রী। সম্প্রতি সেই অতি স্পর্শকাতর বিষয়টি উস্কে আবারও বিতর্কের আঁচ বাড়ালেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বললেন, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের নিজেদের মধ্যে কথোপকথনের সময় ব্যবহার করা উচিত হিন্দি ভাষা, ইংরেজি নয়। হিন্দিই হোক ইংরেজির বিকল্প।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্য ঘিরে ক্ষোভে তোলপাড় বিরোধী শিবির। বিরোধীরা দাবি করেছেন, বিজেপি ও তার সহযোগী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান এজেন্ডাই হলো বাংলা, তামিল, তেলেগু, মারাঠি ও মালায়লামের মতো আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে গলা টিপে হত্যা করে সারা ভারতে হিন্দি ভাষার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা।
বৃহস্পতিবার সরকারি ভাষা সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে হিন্দির পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তার বক্তব্য, ‘দেশের সংহতি রক্ষা করতে হিন্দিকে বাড়তি গুরুত্ব দিতেই হবে।’
অমিত শাহ বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঠিক করেছেন সরকারি কাজে সরকারি ভাষাই ব্যবহার করতে হবে। এতে অবশ্যই হিন্দির গুরুত্ব বাড়বে। সরকারি ভাষাকে দেশের সংহতি রক্ষার কাজে ব্যবহার করার সময় এসেছে।’
শাহ-র বক্তব্য, 'যখন দুইটি আলাদা ভাষার সরকারি কর্মীরা নিজেদের মধ্যে কথা বলবেন, তাদের ভাষা যেন এদেশীয় হয়। ইংরেজি নয়।'
সংবিধান বলছে, ভারতে সরকারি ভাষা ২২টি। এর মধ্যে শুধু হিন্দি ও ইংরেজি, এই দুইটি ভাষাতে কাজ করে কেন্দ্রীয় সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, কমবেশি ৭০ শতাংশ সরকারি কাজ এখন হিন্দিতে হয়। আগামী দিনে সেটা আরও বাড়াতে চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার সাফ কথা, 'ইংরেজির বিকল্প ভাষা হতে পারে একমাত্র হিন্দি। অন্য কোনও আঞ্চলিক ভাষা নয়। তবে হিন্দিকে অন্যান্য ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করে নমনীয় হতে হবে।'
অমিত শাহের এই 'ভাষা'গত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ব্যাপক হইচই পড়ে গেছে সর্বত্র। বিরোধী শিবিরের তরফেও ক্রমাগত তীব্র বিরোধিতা করা হয়েছে এই বক্তব্যের। তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভা মুখ্য সচেতক সুখেন্দু শেখর রায় বলেন, ‘দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে এই ধরনের বিভাজনবাদ মানায় না। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে সীমা লঙ্ঘন করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন তিনি। তিনি দেশের ঐক্য ও সংহতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন।’
সুখেন্দু জানান, ‘ভারত বহুত্ববাদী দেশ। নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের মাঝেও ঐক্যের সংস্কৃতি এই দেশের পরম্পরা ও ঐতিহ্যে মিশে। তিনি (শাহ) সেসব নস্যাৎ করে হিন্দি ও হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনের তীব্র উস্কানি দিচ্ছেন যার ফল মারাত্মক হতে পারে।’
সুখেন্দু এও জানান, বিজেপির প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ভাষা ও সংস্কৃতিগত কোনও আগ্রাসনকে গুরুত্ব দেননি। এসব উস্কানিমূলক মন্তব্য করার আগে ইতিহাসটা ভালো করে জানুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সিপিএমের বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ‘একটা ফ্যাসিস্ট সরকারের কাছে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা যায় না। হিন্দি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের নির্দশন এসব। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষরা যদি এই বেলা একজোট না হন, সেক্ষেত্রে সমূহ বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।’
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, ভাষাতাত্ত্বিক অধ্যাপক পবিত্র সরকারের মতে, 'ভারত একটি বহু ভাষাভাষী সার্বভৌম রাষ্ট্র। বিবিধের মধ্যে মিলন যার মূলমন্ত্র। এখানে সব ভাষার মাধুর্যই সমান। কোনও একটি ভাষা নিয়ে এভাবে মত আরোপ করা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাজে না।'