পশ্চিমবঙ্গজুড়ে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতিকে ইস্যু করে এবার শাসক দলের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেছে সিপিএম। আলিমুদ্দিনের নির্দেশে মূলত সিপিএমের ছাত্র-যুব সংগঠনকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই ইস্যুতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার। এমনটাই সূত্রের খবর।
রাজনৈতিক মহলের মতে, একুশের বিধানসভা ভোটে বাংলার পরিষদীয় রাজনীতি শূন্য হয়ে যাওয়ার পর বামেরা রাজনীতির ময়দানে ফিরে আসার জন্য প্রবল চেষ্টা চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচনে বামেদের ভোট শতাংশের হারে প্রধান বিরোধী দল বিজেপির চেয়ে সামান্য বাড়ায় কিছুটা হলেও অক্সিজেন পেয়েছে তারা। এবার সেই ধারাবাহিকতায় শাসক দলের বিরুদ্ধে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়িয়ে বিজেপিকে সরিয়ে প্রধান বিরোধী দল হয়ে উঠার টার্গেট নিয়েছেন আলিমুদ্দিনের কর্তারা।
দলের মধ্যে প্রবীণরা ক্ষমতা দখল করে রেখেছেন, এমন অভিযোগ দূরে সরিয়ে একুশের বিধানসভা থেকেই নবীন প্রজন্মকে প্রার্থী তালিকায় নিয়ে আসা হয়। দলের শীর্ষস্থানীয় পদেও জায়গা করে নিতে দেখা গেছে যুব নেত্রী মীনাক্ষী, ছাত্র নেতা সায়নদেবদের।
আলিমুদ্দিন মনে করছে, গণআন্দোলনের ক্ষেত্রেও যুব-ছাত্র নেতাদের নেতৃত্বের সামনের সরিতে নিয়ে আসলে আখেরে তা কাজে দেবে। আর সেই পরিকল্পনাতেই দেখা যাচ্ছে, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির ইস্যুতে আন্দোলনের প্রথম সারিতে মীনাক্ষীরা।
বৃহস্পতিবার কলকাতার এসএলএসটি ধরণা মঞ্চে অতর্কিতে পুলিশি হানার অভিযোগ উঠে। পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক ধ্বস্তাধস্তির পর লকআপে অসুস্থ হয়ে পড়েন চার জন। এ সময় তারা ফিনাইল খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ।
লালবাজারের লকআপে আত্মহত্যার চেষ্টার অভিযোগের ঘটনা ছড়িয়ে পড়তেই রাতে পথে নামেন মীনাক্ষীর নেতৃত্বে সিপিএমের যুবরা। প্রথমে এসএসকেএম হাসপাতালে আন্দোলনকারীদের না পেয়ে সারা রাত ধরে থানায় থানায় খোঁজ শুরু করেন মীণাক্ষীরা। রাত ২টা ৫৫ নাগাদ লালবাজার যান তারা। সেখানেও কোনও রকম সদুত্তর না পেয়ে কথা বলেন হেয়ার স্ট্রিট থানার সঙ্গে। ৪টা ১৫ নাগাদ ময়দান থানাতে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন চাকরি প্রার্থীদের ময়দান থানা গ্রেফতার করেছে।
ভোর ৫টায় ময়দান থেকে বেরিয়ে মীনাক্ষী বলেন, ‘মোট ৬৭ জনকে আটক করেছে পুলিশ। চার জন অসুস্থ হয়েছিল। এসএসকেএমে চিকিৎসা হয়েছে। তাদের কী অসুস্থতার জন্য চিকিৎসা করানো হয়েছে কেউ কিছু বলছে না। চাকরি প্রার্থীরা ছাড়া পেলে তবেই বোঝা যাবে, কেন তাদের চিকিৎসা করাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।’
এর আগেও শিক্ষক নিয়োগে অভিযুক্ত মন্ত্রী পরেশ অধিকারীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা যায় মীনাক্ষীকে। তিনি বলেন, ‘চোর যখন ধরা পড়ে, সবার আগে যা চুরি করা হয়েছে, সেটি উদ্ধার করা হয়। চুরি করে যে চাকরির বেতন নিয়েছে, সেই টাকা তো আমাদের টাকা। আমাদের টাকা কী ফেরত দেবে না?’
মন্ত্রীর মেয়ে অঙ্কিতা অধিকারীর বিষয়ে মীনাক্ষী বলেন, ‘ওকে ভুল শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের যে ১১ বছরের সরকার, রাজ্যের ছেলেমেয়েদের যে ভুল পথে নিয়ে যেতে চাইছে, সেই ভুল পথে নিয়ে যাওয়ার শিকার হয়েছেন অঙ্কিতা অধিকারী। তার বাবা তৃণমূলের নেতা। তাকে যদি আমরা যুব সমাজের প্রতিনিধি ধরি, তাহলে তাকে এই শেখানো হয়েছে, যে তুমি পরীক্ষায় পাস না করলেও, তুমি ঘুষ দিতে পারলে, তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ হতে পারলে, তোমার চাকরি হয়ে যাবে। আজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতি কার হলো? আমি যদি তাকে যুব সমাজের প্রতিনিধি ধরি, তাহলে আগামী দিনে রাজ্যের একজন বেকার মেয়ের বা একজন বেকার ছেলের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হলো। এই ক্ষতির জন্য দায়ী পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার।’
রাজনৈতিক মহলের মতে, শহরাঞ্চল নয়, গ্রামাঞ্চলের ভোটকেই টার্গেট করেছে সিপিএম। কারণ সামনেই পঞ্চায়েত ভোট। শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামাঞ্চলের যুবক-যুবতীরা।
এই আন্দোলনে পাশে থেকে পরবর্তীতে নেতৃত্ব যদি মিনাক্ষীরা নিতে পারেন তবে তার ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে পঞ্চায়েত ভোটে। এমনটাই হয়তো ভাবছেন আলিমুদ্দিনের কর্তারা। এক্ষেত্রে বাংলার গ্রামাঞ্চল থেকে উঠে আসা মীনাক্ষীর নেতৃত্ব হয়ে উঠতে পারে শাসক দলের বিরুদ্ধে বামেদের তুরুপের তাস।
একুশের বিধানসভা ভোটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি আগেই নিজের জাত চিনিয়ে দিয়েছেন। তিনি যে রাজনীতির ময়দানে লম্বা রেসের ঘোড়া তাও বুঝিয়ে দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত।