দুই দিনের ইডি হেফাজতে পার্থ, হাসপাতালে ভর্তি

দীর্ঘ ২৭ ঘণ্টা পর যবনিকা পতন। শনিবার (২৩ জুলাই) সকালে এসএসসির শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি তদন্তে গ্রেফতার হলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী ও প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। সেই সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছেন পার্থ-ঘনিষ্ঠ অর্পিতা মুখোপাধ্যায়। গ্রেফতারের পর তাকে ব্যাংকশাল কোর্টে তুলে ২ দিনের হেফাজতে নেয় ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি। এদিন সন্ধ্যায় পার্থ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ব্যাংকশাল আদালত থেকে নিয়ে গিয়ে এসএসকেএম হাসপাতালের আইসিসিইউতে ভর্তি করা হয়।

২৭ ঘণ্টা ধরে এসএসসির শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি তদন্তে দক্ষিণ কলকাতায় রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের নাকতলার বাড়িতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ইডি। এরপরই সকাল ১০টা নাগাদ তাকে গ্রেফতার করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা। একইসঙ্গে এই তদন্তের স্বার্থে অর্পিতা মুখোপাধ্যায়কে তার হরিদেবপুরের ডায়মন্ড সিটি সাউথ আবাসন থেকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতার হওয়ার পর পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘নেত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলাম। পাইনি।’ জানা গেছে, জেরা চলাকালে শারীরিক অসুস্থতাও বোধ করছিলেন তিনি। চিকিৎসকরাও গিয়েছিলেন তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে দেখার জন্য। একটি সূত্রে জানা গেছে, তিনি বারবারই নাকি বলেছেন, ‘সমস্ত শেষ! তার মানসম্মান সমস্ত নষ্ট হয়ে গেল।’ যদিও তার এই বক্তব্যের কোনও আনুষ্ঠানিক সমর্থন ইডি সূত্রে করা হয়নি। বরং ইডি সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতার হওয়া পর্যন্ত পার্থর মধ্যে তেমন কোনও অসুস্থতা দেখা যায়নি। তবে মানসিকভাবে তিনি যথেষ্ট ভেঙে পড়েছেন। পার্থর আইনজীবী অনিন্দ্য রাউত বলেন, এখনও সিজার (জব্দ) তালিকা আমাদের হাতে দেয়নি। কোন কোন ধারায় গ্রেফতার সেটাও এখনও বলেনি।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ অভিনেত্রী ও মডেল অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের হরিদেবপুরের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার টাকার পরিমাণ এতটাই যে রিজার্ভ ব্যাংক থেকে আনতে হল ৪০টি ট্রাংক! শুধু তাই নয়, লরি করে পাঠাতে হলো এই রাশি রাশি টাকা। জানা গেছে, অর্পিতার ফ্ল্যাট থেকে মোট ২১ কোটি ২২ লাখ নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। পাওয়া গেছে, ২০টি সেলফোন, ৮৯ লাখ টাকার সোনার গয়না ও ৫৫ লাখ বিদেশি মুদ্রা। এমনটাই ইডি সূত্রের খবর। অর্পিতার কাছ থেকে পাওয়া টাকা গোনার পর তা ট্রাকে ভরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক (আরবিআই)। ৪০টি ট্রাংকে ভরে সেই টাকা নিয়ে যাওয়া হয়। ট্রাংকের গায়ে কোনোটায় লেখা ৫০০, কোনওটায় লেখা ১০০০।

শুক্রবার (২২ জুলাই) ইডি আধিকারিকরা ওই ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে এত বিপুল টাকা উদ্ধার হওয়ায় সেদিনই কাজের সুবিধার্থে তিনটি নোট গোনার মেশিন আনা হয়েছিল। রাতভর টাকা গুনেও শেষ করা যায়নি। পরে মেশিনের সংখ্যা আরও বাড়ানো হয়। শনিবার বিকাল পর্যন্ত সেই টাকা গোনার কাজ চলেছে বলে খবর। অর্পিতা ওই টাকার উৎস আড়াল করার চেষ্টা করছেন বলে ইডি’র অভিযোগ। তাই তাকে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করার ভাবনা রয়েছে তদন্তকারীদের।

এদিকে সূত্রের খবর, অর্পিতার বাড়িতে যেখানে ওই নোটের পাহাড় পাওয়া গেছে, সেখানেই পাওয়া গেছে একটি খাম। তাতে এসএসসির বেশ কিছু অ্যাডমিট কার্ড পাওয়া গেছে। তাকে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার সময় অর্পিতা দাবি করেন, ‘আমি কোনও অন্যায় করিনি। বিজেপির চাল। আমাকে ফাঁসানো হয়েছে।’ প্রথমে তাকে জোকা ইএসআই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে ব্যাংকশাল আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়।

নাকতলার বাড়ি থেকে গ্রেফতারের পর কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ইডি আধিকারিকরা পার্থকে নিয়ে বাইপাস দিয়ে পার্ক সার্কাস ঘুরে বেহালা হয়ে জোকায় কেন্দ্রীয় সরকারের ইএসআই হাসপাতালে নিয়ে যার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য। এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয় তার। এরপর হাসপাতালের পিছনের একটি গেট দিয়ে বের করার ব্যবস্থা করা হয় পার্থকে। এরপর দুপুর ২টা ৪৪ মিনিটে ব্যাংকশাল আদালতে নিয়ে যাওয়া হয় পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে। সিআরপিএফের কড়া পাহারায় আদালত চত্বরে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে তাকে পেশ করা হয়। কারণ শনিবার ইডির বিশেষ আদালত বন্ধ। শুনানির সময় পার্থ চট্টোপাধ্যায় অসুস্থ বোধ করায় লকআপেই রাখা হয় তাকে। এদিন ইডির পক্ষ থেকে ১৪ দিনের হেফাজতের আবেদন জানানো হয়। অর্পিতার আইনজীবী আদালতে বলেন, ‘তার কাছ থেকে কোনও টাকা পাওয়া যায়নি। বাড়ি থেকে যে নথি পাওয়া গেছে, তা সবই প্রতিলিপি। আসল কোনও নথি পাওয়া যায়নি।’ পাশাপাশি পার্থর আইনজীবী বলেন, ‘উনার ৭০ বছর বয়স হয়েছে। আর উনি পালিয়েও যাচ্ছেন না।’ এসএসসি দুর্নীতি মামলার তদন্ত করছে সিবিআই। এর আগে, সিবিআইয়ের তলবেও হাজিরা দিয়েছেন পার্থ। আদালতে সেই উদাহরণও দেন আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘সিবিআই যতবার যেতে বলেছে ততবার তিনি গেছেন।’

পাল্টা ইডির আইনজীবী বলেন, ‘গত ১৪ তারিখ অভিযানে নেমে দুইটি জায়গা নিয়ে সন্দেহ হয় তাদের। অর্পিতার নামে সমস্ত সম্পত্তির কাগজ মিলেছে। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে সাতটি দলিল পাওয়া গেছে। উদ্ধার হয়েছে পেন ড্রাইভ। দলিল অর্পিতার নামে। ফ্ল্যাট, জমিও রয়েছে।’

এরপরেই ইডির আইনজীবী দাবি করেন,  ‘পার্থ-অর্পিতার সরাসরি যোগ রয়েছে। টাকার মাধ্যমে প্রচুর সম্পত্তি কেনা হয়েছে। কিছু টাকা অর্পিতার ফ্ল্যাটে সরানো হয়েছে। কোনও সূত্র না পেলে অযথা হেনস্থা করবই বা কেন? টাকার উৎস, কীভাবে বিলি-বণ্টন হতো, তা জানতে হেফাজতে চাইছি। ১৪ দিনের জন্য হেফাজতে চাই।'

পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। আদালতে এমনই আবেদন করেছেন পার্থর আইনজীবী। আইনজীবী বলেছেন, ‘পার্থর ক্রিয়েটিনিন অনেকটাই বেশি। দ্রুত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।’ এছাড়াও আদালতে পার্থর আইনজীবীদের তরফে এদিন আবেদন করা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় আইনজীবীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। যদিও এই আবেদনের শুনানি এখনও হয়নি। এরপরই আপাতত দুই দিনের জন্য ইডি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন বিচারক। সোমবার স্পেশাল পিএমএলএ কোর্টে তোলার নির্দেশ দেন ব্যাংকশাল আদালতের বিচারক। আপাতত অর্ডার রিজার্ভ রাখা হয়েছে।

এরপরই স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ব্যাংকশাল আদালত থেকে এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে। হুইল চেয়ার বসে হাসপাতালে পৌঁছান তিনি। সেখানে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়। পার্থ এসময় বলেন, ‘শরীর ভালো নেই। বুকে ব্যথা করছে।’ এরপরই তাকে আইসিসিইউতে ভর্তি করা হয়।