ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি)ইচ্ছায় মান্যতা দিলো আদালত। ভুবেনশ্বর এইমসের চিকিৎসকদের ফিট সার্টিফিকেট দেখে হাসপাতালে নয়, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে ইডির বিশেষ আদালত ১০ দিনের ইডি হেফাজতের নির্দেশ দিলো। সেই সঙ্গে ২০ কোটিরও বেশি টাকা নিয়ে ধরা পড়া পার্থ-ঘনিষ্ঠ অভিনেত্রী মডেল অর্পিতা মুখোপাধ্যায়কে ১০ দিনের ইডি হেফাজতের নির্দেশ দেয় আদালত। অভিযুক্ত দুজনকে প্রতি ৪৮ ঘণ্টা পর পর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে।
কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তৃণমূল মহাসচিবের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এসএসকেএম হাসপাতাল থেকে তাকে সোমবার সকালে অ্যাম্বুলেন্সে করে কলকাতা বিমানবন্দরের নিয়ে যাওয়া হয়। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে সকাল ৮টা ২৯ মিনিটে পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ভুবনেশ্বরের উদ্দেশে রওনা দেয়। ভুবনেশ্বর বিমানবন্দরে নামার পর হুইল চেয়ারে বসে বাইরে বের হন তিনি। সেখান থেকে সকাল সাড়ে ১০টায় অ্যাম্বুলেন্সে করে ভুবনেশ্বর এইমসে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে পৌঁছতেই পার্থকে ঘিরে শুরু হয় বিক্ষোভ। বাংলা থেকে চিকিৎসা করতে যাওয়া রোগীর পরিবারের লোকজনরা তাকে ঘিরে ‘চোর চোর’ বলে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। বিক্ষোভের মধ্যেই ইডির আধিকারিকরা ও নিরাপত্তা কর্মীরা পার্থকে হাসপাতালের ভিতরে নিয়ে যান। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করে দেন চিকিৎসকরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রথমেই মন্ত্রীর ওজন, নাড়ির গতি, রক্তচাপ ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়। পার্থকে চিকিৎসকেরা জিজ্ঞাসা করেন, তার কী কী শারীরিক সমস্যা হচ্ছে। তিনি সমস্যার কথা জানান। পরে তার হৃদযন্ত্রের ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম ইত্যাদি করানো হয়। নানা ধরনের রক্তপরীক্ষাও করা হচ্ছে। এসএসকেএমে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন মন্ত্রীর যে সব ডাক্তারি পরীক্ষা হয়, সে সবের রিপোর্টও দেখা হয়। তবে সব পরীক্ষাই আবার নতুন করে করা হয় এইমসে।
ভুবনেশ্বর এইমসের একজিকিউটিভ ডিরেক্টর আশুতোষ বিশ্বাস জানান, পার্থর জন্য চার সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তারা মন্ত্রীর শারীরিক পরীক্ষার রিপোর্ট খতিয়ে দেখবেন। রিপোর্ট এলেই আলোচনায় বসবে মেডিক্যাল বোর্ড। এসএসকেএমে পার্থের চিকিৎসা করেছিলেন যে চিকিৎসকেরা, তাদের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে। তারপর দু’পক্ষের আইনজীবীকে সমস্ত তথ্য দেবেন তারা। দুপুর তিনটের মধ্যে যাতে সব রিপোর্ট তৈরি করে ফেলা যায়, তার চেষ্টা চলছে।’
এরপর আদালতের নিয়ম মেনেই বিকাল তিনটার মধ্যে এইমস জানিয়ে দেয়, পার্থর হাসপাতালে থাকার দরকার নেই। পার্থর শারীরিক পরীক্ষার রিপোর্ট এইমসের তরফে তুলে দেওয়া হয়েছে এসএসকেএম কর্তৃপক্ষ, ইডি এবং পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের আইনজীবীর হাতে। এইমসের একজিকিউটিভ ডিরেক্টর আশুতোষ বিশ্বাস সাফ বলেন, ‘উনার চার-পাঁচ রকমের রোগ রয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে উনি অনেক ওষুধ খাচ্ছেন। তার অসুস্থতা ‘সিরিয়াস’ নয়। আমরা তাকে দ্রুত ছেড়ে দেব। কিছু নিয়মিত সমস্যায় ভুগছেন উনি। ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। তবে হাসপাতালে ভর্তি রাখার দরকার নেই।’
বিকালে ইডির বিশেষ আদালতে ভুবনেশ্বর এইমসের দেওয়া রিপোর্ট পেশ করে দাবি করা হয়, ‘পার্থ ও অর্পিতার যৌথ সম্পত্তি রয়েছে’। ইডি আইনজীবী বলেন, ‘এটি একটি সিরিয়াস স্ক্যাম। যারা চাকরি পাওয়ার যোগ্য তারা পায়নি। কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীরা টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছেন। হাইকোর্টের নির্দেশ মতো তদন্ত করছে ইডি। পার্থ ও অর্পিতার বাড়িতে তল্লাশি অভিযান চালানো হয়েছে। সেখানে প্রচুর টাকা-সোনা পাওয়া গেছে। সম্পত্তির নথি পাওয়া গেছে— যেগুলো পার্থ অর্পিতার নাম যৌথভাবে রয়েছে। পার্থর বাড়িতেও অনেক নথি পাওয়া গেছে।
কেন তাকে এসএসকেএমে নিয়ে যাওয়া হল, "এসএসকেএম হাসপাতাল আমার হাসপাতাল", পার্থ বলেছে ইডির কাছে। তার ভিডিও আছে। এইমস রিপোর্ট দিয়েছে। পার্থর অক্সিজেন ১০০ শতাংশ, ব্লাড প্রেশার ১২০/৬১, পালস ৮১। কোনও জ্বর নেই। ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে। হাইপারটেনশন আছে। ওভার অল তিনি সুস্থ। কোনও মেডিক্যাল রিকয়ারমেন্ট নেই। তিনি সরকারের এয়ার অ্যাম্বুলেন্স খরচ করিয়েছেন। তাকে ইডি হেফাজতে দেওয়া হোক৷ তিনি হাসপাতালের সুযোগ নিয়েছেন। সাধারণ মানুষ চাকরি পাচ্ছেন না। টাকার জোরে চাকরি পাচ্ছেন।’
ইডির আইনজীবীরা আদালতে অভিযোগ করেন, ‘পার্থ চট্টোপাধ্যায় তদন্তে সহযোগিতা করছেন না। ইডির গাড়িতে দুর্ঘটনা হয়েছে সেটাকে টেররিস্ট অ্যাটাকের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। যারা আহত হয়েছেন তারা ইডির অফিসার৷ এসএসকেএমে খারাপ ব্যবহার পেয়েছে ইডি। প্রায় ১২০ কোটি টাকার স্ক্যামের আশঙ্কা করা হচ্ছে। যার মধ্যে ২১ কোটির কিছু বেশি টাকা উদ্ধার হয়েছে। মিথ্যে অসুস্থতা দেখিয়েছেন। পার্থ চ্যাটার্জী ভুবনেশ্বর যেতে চাননি। তা ভিডিও আছে। দুজনকে জেরার জন্য ইডি হেফাজত প্রয়োজন। এর সঙ্গে আর কে জড়িত তা জানতে হবে তদন্তে জন্য। পার্থর বাড়ি থেকে গ্রুপ ডি এডমিট কার্ড পাওয়া গেছে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারও পাওয়া গেছে। অর্পিতা ২০টা মোবাইল ব্যবহার করত কেন? পার্থ অ্যারেস্ট মেমোতে সই করতে চায়নি। তার বাড়ি থেকে নথি পাওয়ার পরেও চায়নি। অর্পিতার বাড়িতে টাকা পাওয়ার কথা শোনার পর সই করেছে। আমরা ১২ বা ১৪ দিনের ইডি হেফাজত আবেদন করছি।’
ইডির বিশেষ আদালতে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের আইনজীবী এদিন স্বীকার করে বললেন, ‘অর্পিতা আমার পরিচিত। আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমার জুনিয়রের বাড়ি থেকে টাকা পাওয়া গেলে, আমার সঙ্গে যোগ কোথায়? পার্থকে কেন গ্রেফতার করা হল? হাইকোর্ট মামলাটির ওপর নজর রাখছে। তারা গ্রেফতারের কথা বলেনি। ইডি তদন্ত করছিল। পার্থবাবুকে সমন পাঠানো হয়েছিল। তিনি গিয়েছিলেন। বিনা নোটিশে ইডি ২৪ ঘণ্টা ধরে তার বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে। তারপরেও গ্রেফতার কেন করা হল?’
পার্থর ১৪ দিনের ইডি হেফাজতের বিরোধিতা করে পার্থের আইনজীবী দেবাশিষ রায় আদালতে বলেন, ‘২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পার্থর বাড়িতে ছিলেন ইডির আধিকারিকরা। তারপর তাকে গ্রেফতার করে ইডি। ইডির হেফাজত থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। হিসাব করলে দেখা যাবে, ইতোমধ্যে পার্থ তিনদিন ইডির হেফাজতে রয়েছে।’
এ প্রশ্নের জবাবে ইডির হয়ে ভার্চুয়ালি সওয়াল করেন কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এম রাজু। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি থাকলে তাকে পুলিশি বা বিচারবিভাগীয় হেফাজত বলা চলে না। আমরা ইতোমধ্যে দুটি দিন হারিয়েছি। তাই পার্থকে আরও ১৪ দিনের হেফাজতে চাইছি আমরা। অর্পিতাকে ১২ দিনের জন্য হেফাজতে নিতে চাইছি।’
এই শুনানির সময় এজলাসে হাজির করা হয় অর্পিতা মুখোপাধ্যায়কে। ইডির আইনজীবীর বলেন, ‘অর্পিতার বাড়িতে টাকা গুনতেই দু’দিন কেটে গিয়েছে। দু’দিন এজলাসে কাটল। জিজ্ঞাসাবাদের সময় কোথায় পাওয়া গেল? তাকে ১৩ দিনের জন্য ইডি হেফাজতে দেওয়া হোক।’
সব পক্ষের বত্তব্য শুনে শুনানি শেষ হয়। রাত ১১ নাগাদ আদালত রায় দেয়— পার্থ ও অর্পিতাকে ১০ দিনের জন্য ইডি হেফাজতে পাঠানো হলো।