নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিংহ যখন পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ভোটে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৪০টি লাশের হিসাব খুঁজছেন, ঠিক তখন বিরোধী দল নয়, খোদ শাসকদলের ভেতরে উঠেছে প্রশ্ন, ‘এত রক্তপাত করে জিতে কী লাভ!’ দলের অভ্যন্তরে উঠে আসা এই প্রশ্নে, পঞ্চায়েত ভোটে সবুজ আবির মেখে বিপুল জয়ের আনন্দে গা ভাসানোর পরেও যথেষ্ট অস্বস্তিতে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস।
মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত ভোটের ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে। প্রত্যাশামতোই বিপুল জয়ের পথে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। অনেকটাই পিছনে রয়েছে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। তারও অনেক পিছনে রয়েছে বাম-কংগ্রেস জোট। এরই মধ্যে ভোট সহিংসতা নিয়ে রাজ্যের মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় দাবি করেছেন, ‘তৃণমূল এমনিতেই জিততো। যে সব জায়গায় গণ্ডগোল হয়েছে তার দরকার ছিল না!’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা সত্যি যে, প্রায় ৭০ হাজার বুথের মধ্যে যে ১০০টি বুথে গণ্ডগোল হয়েছে, সেটাই সংবাদমাধ্যম বার বার দেখিয়েছে। কিন্তু আমি সংবাদমাধ্যমকে দোষ দিতে রাজি নই। ৭০টি বুথের গণ্ডগোল থেকে যদি ৪০টি প্রাণ যায়, তা আমাদের সবাইকে বিড়ম্বনায় ফেলে। আমাদের নিচু তলার কর্মীদের বুঝতে হবে যে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করতে মুখ্যমন্ত্রী যে প্রকল্পগুলো চালু করেছেন তাতে মানুষ খুশি। এমনিতেই তারা তৃণমূলকে ভোট দিতেন। এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করার দরকারই ছিল না।’
তৃণমূল বিধায়ক তথা অভিনেতা চিরঞ্জিৎও বাম জমানা শেষ হওয়ার উদাহরণ তুলে বলেছেন, ‘এভাবে জেতার কোনও অর্থ হয় না। মানুষ ঘুরে গেলে এমনভাবেও ক্ষমতায় থাকা যায় না। বাঙালি হিসেবে কে লজ্জিত নন, বলুন তো! সবাই লজ্জিত। আমি নিজেও লজ্জিত। এরকম তো হওয়ার কথা নয়। হওয়া উচিত নয়। মৃত্যু কেন হবে? ভোটে সহিংসতা, মৃত্যু, বঙ্গ রাজনীতিতে ট্র্যাডিশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের নয়, এটা অনেক বছর ধরে হয়ে আসছে। নতুন কিছু নয়। তবে, আমি যেটা উপলব্ধি করেছি, ৩৪ বছর ধরে রাজত্ব করার পরও এরকমই শাসকদল বুঝতে পেরেছিল, ইচ্ছে করলেই ভোটে জেতা যায় না। কারণ, ২৩৫ আসন পেয়েও বামেদের হারতে হয়েছিল পরের ভোটে। এটাই বাস্তবতা। তাই, মানুষ যখন সত্যি সত্যি ঘুরে যাবে, কাউকে প্রত্যাখ্যান করবে, তখন কিন্তু এভাবেও (রিগিং, ছাপ্পা ভোট) ভোটে জিততে পারবে না। যেটা বামফ্রন্ট করেও একসময় জিততে পারেনি।’
কামারহাটির বিধায়কের মদন মিত্রর সাফ কথা, ‘গণতন্ত্রে দায়িত্ব সবার রয়েছে। কারণ এভাবে চলতে থাকলে একসময় আর বুথে ভোট দিতে যেতেই ভয় পাবেন। যেটা হলে কিন্তু মুশকিল। রাজ্যের নির্বাচনে রক্তের হোলি খেলা বন্ধ হোক। মারবো, খুন করবো, দখল করবো, পশ্চিমবঙ্গের এই সংস্কৃতি খুব দুঃখের। রক্তের হোলির মধ্যে দিয়ে এটাই যেনও শেষ নির্বাচন হয়। পশ্চিমবঙ্গের এই খুনের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।’
পঞ্চায়েত ভোটে এই রক্তপাতের জন্য তৃণমূলের প্রবীণ সাংসদ সৌগত রায় কার্যত রাজ্য নির্বাচন কমিশনকেই দায়ী করেছেন। তার বক্তব্য, ‘যা ঘটেছে, ঠিক হয়নি। একটিও মৃত্যু না হলেই ভাল হতো। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবর শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের কথা বলেছেন। আমার মনে হয়, কমিশনের আরও সতর্ক থাকা দরকার ছিল।’
ডেবরার বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের বলেছেন, ‘বাঙালি হিসেবে আমি লজ্জিত, মর্মাহত। মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে লজ্জায়। আর কতদিন এসব চলবে? যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে। কিন্তু আমরা বদলাতে পারছি না। কেন প্রাণহানি শূন্য করা যাচ্ছে না? আমি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। এই লাগামহীন সন্ত্রাসের জন্য কোনও একজন দায়ী নয়। প্রতিটা রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ দায়ী। কারণ, পুলিশ বা প্রশাসন যদি আগে থেকে সক্রিয় থাকতো, তাহলে এই সহিংসতা এড়ানো যেত। পুলিশের কাছে সব খবর থাকে। তারা কেন আগে থেকে কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করলো না? সেই প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন সন্ত্রাসহীন ভোট হবে। রক্তপাতহীন ভোট হবে। তবে হলো কোথায়?’
তিনি আরও বলেছেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো আমরা অনেকটা এগিয়ে গিয়েছি। মানুষ বুঝতে শিখেছে। প্রশাসন কঠোর হয়েছে। কিন্তু কাল যে দৃশ্য দেখলাম তাতে আমি মর্মাহত। যাদের গেলো তাদের তো গেলো। কেউ স্বামীকে হারালো, কেউ বাবাকে। ভাবতেই পারছি না।’
আগেই বিক্ষুব্ধ ছিলেন পঞ্চায়েতের প্রার্থী দেওয়া নিয়ে, এবার ভোট নিয়ে বিস্ফোরক ইসলামপুরের তৃণমূল বিধায়ক আবদুল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এরকম রক্তাক্ত করে জিতে কী হবে। জেতার জন্য খুন, লুঠ, পুলিশকে ব্যবহার করা যায় না। জাকির হোসেন আর কানাইয়া আগরওয়ালের নেতৃত্বে একাধিক বুথে তৃণমূলের লোকজন ভোট লুঠ করে নিয়েছিল। আসলে জাকির হোসেন তার স্ত্রী নার্গিসকে প্রধান বানাতে চায়। ওরা বোমাবাজি করে সবাইকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। কোনও কেন্দ্রীয় বাহিনী ছিল না। খুব খারাপ লাগছে দলের এই অবস্থা দেখে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন ওদের হাতে দল ছেড়ে দিলো? পুলিশ নেই, প্রশাসন নেই। কিচ্ছু ছিল না বুথে।’