হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাঙালিদের পুশব্যাক করছে ভারত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু বাঙালি বাসিন্দাদের, যাদের বেশিরভাগই মুসলিম, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) লোকজনকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) তাদের প্রবেশ ঠেকিয়ে দেওয়ায় বহু পরিবার দুই দেশের মধ্যবর্তী ‘জিরো লাইনে’ আটকা পড়ছে।

বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে বিএসএফের ২১টি পুশ-ইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২০০ জনের বেশি মানুষ, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে প্রবেশের চেষ্টা করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন তার সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় শত শত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে আটক করা হয়েছে এবং প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে নির্মমভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রাখছে, যা তাদের মৌলিক মানবাধিকারকে উপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, সরকারকে এই অবৈধ পুশব্যাক বন্ধ করতে, আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নয়জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তারা জানিয়েছেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা রাতের বেলায় লোকজনকে সীমান্তে এনে কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে বিজিবি তাদের প্রবেশে বাধা দিলে বিএসএফ পরে তাদের ভারতে ফিরিয়ে নেয়।

বাংলাদেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে গত ৫ জুন শিশুসহ ১০ জনকে পুশব্যাকের চেষ্টার পর দুই বাহিনীর মধ্যে ৭৫ ঘণ্টার অচলাবস্থার কথা জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। রুবেল হোসেন (৩৫) নামে স্থানীয় এক গ্রামবাসী জানান, দলটি বাংলাদেশি ভূখণ্ডের ভেতরে প্রায় ৫০ ফুট চলে এসেছিল। গ্রামবাসীরা বিজিবিকে সতর্ক করলে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং দলটি পিছু হটে নো ম্যানস ল্যান্ডের বাঁধে অবস্থান নেয়। 

তিনি বলেন, প্রথম রাতে তারা প্রচণ্ড বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টির মুখে পড়ে। দ্বিতীয় দিনে বিএসএফ তাদের কিছু শুকনা খাবার দেয়। বিএসএফ ও বিজিবির ব্যাপক মোতায়েনে এটি যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। দুই বাহিনীর মধ্যকার বেশ কয়েক দফা পতাকা বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে বিএসএফ তাদের ভারতের দিকে ফিরিয়ে নেয়।

একইভাবে ৬ জুন ভোরে টেটুলবাড়িয়া সীমান্তে দুটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের শিশুসহ ৬ সদস্যকে পুশব্যাকের চেষ্টা করা হলে তারা বিজিবির বাধায় আটকা পড়ে। খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানোর পর বিএসএফ তাদের ফেরত নেয়। এছাড়া ৮ জুন ঠাকুরগাঁওয়ের জিরো লাইনে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা আটকে থাকার পর এক গর্ভবতী নারী ও শিশুসহ ১১ জনকে ফেরত নেয় বিএসএফ বলে জানিয়েছে বিজিবি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চের নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ৯০ লাখের বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়। এর ফলে আটক ও পুশব্যাকের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া ২০১৯ সালে আসামে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার কারণে ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছিল এবং বহু বাংলা ভাষাভাষী বাসিন্দাকে আটক করা হয়েছিল।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রাজ্যের বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের বারবার ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি বলেন, আমরা তাদের সীমান্তের কাছাকাছি একটি সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে যাই এবং আক্ষরিক অর্থেই সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিই।

পঞ্চগড় সদর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাসিবুর ইসলাম জানান, তিনি পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে আসা একটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরিবারটির সদস্যদের আধার কার্ড ছিল। কিন্তু সংশোধিত ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় পুলিশ তাদের আটক করে এবং সীমান্তরক্ষীদের হাতে তুলে দেয়। পরে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তিন দিন সীমান্তে আটকে থাকার পর পরিবারটিকে ভারতে ফেরত নেওয়া হয়।

এইচআরডব্লিউ বলেছে, ভারত দাবি করে অনেক বাংলাদেশি অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছে এবং তাদের স্বেচ্ছায় ফেরত পাঠাতে সহায়তা করতে চায়। তবে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপন্থী। পাশাপাশি আটক ব্যক্তিদের কাগজপত্র, অর্থ ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও তদন্ত করা উচিত।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে শত শত কথিত অবৈধ বাংলাদেশিকে আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তাদের বেশিরভাগ মুসলিম হলেও কিছু হিন্দুও রয়েছে। এক ভারতীয় অধিকারকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায় ৪০০ জন আটক রয়েছেন এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার বলেছে, আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে সীমান্ত পেরিয়ে কাউকে ফেরত পাঠানো হলে তাদের গ্রহণ করা হবে না। যেকোনও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই ও প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা প্রত্যাবাসন করা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসাসেবা ছাড়া মানুষকে সীমান্তে ফেলে রাখা নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের শামিল হতে পারে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, জাতীয়তা যাই হোক না কেন, কোনও মানুষকে দুই সশস্ত্র সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়। ভারতকে এই নির্মম প্রত্যাবাসন বন্ধ করতে হবে এবং উভয় সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যাতে মৌলিক মানবমর্যাদা ক্ষুণ্ন না হয়। 

সূত্র: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ