প্রায় দুই দশক পর আবারও কলকাতায় ফিরেছেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন। ২০০৭ সালে কলকাতা ছাড়ার পর এবার প্রথমবারের মতো শহরটিতে এসে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংবর্ধনা গ্রহণ করেছেন তিনি। এ সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাকে স্বাগত জানান এবং নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। খবর আনন্দবাজারের।
শনিবার (১ আগস্ট) কলকাতার রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নেন তসলিমা। সেখানে সংবর্ধনা গ্রহণ করে তিনি বলেন, ‘ইতিহাস মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল। ইতিহাস মনে রাখবে কারা দরজা খুলেছিল।’
কলকাতায় ফিরে আবেগঘন বক্তব্যে তসলিমা বলেন, দীর্ঘ নির্বাসনের প্রতিটি বছর তার কাছে ছিল একটি করে ‘বন্ধ দরজা’। তিনি বলেন, ‘এতদিন পর কলকাতার মাটিতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, আমি শুধু একটি শহরে ফিরে আসিনি; ফিরে এসেছি আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কাছে।’
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, ‘সুরক্ষিত পশ্চিমবঙ্গে আপনাকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব মুখ্যমন্ত্রীর। আপনি যতবার ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা আসবেন, কথা বলবেন।’
শুভেন্দুর বক্তব্যের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তসলিমা বলেন, এটি তার জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল। তবে একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, একজন লেখককে নিজের ভাষার শহরে পুলিশের নিরাপত্তা নিয়ে চলাফেরা করতে হওয়াটা দুঃখজনক বাস্তবতা। তিনি এমন একটি সময়ের প্রত্যাশা করেন, যখন মতপ্রকাশের কারণে কোনো লেখককে দেশ ছাড়তে হবে না কিংবা পুলিশি নিরাপত্তার প্রয়োজন হবে না।
তসলিমা বলেন, ‘কৃতজ্ঞতা আনুগত্যের চুক্তি নয়। কৃতজ্ঞতার বিনিময়ে আমি আমার স্বাধীন চিন্তাকে বন্ধক দিই না।’ তিনি আরও বলেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে কথা বলতে আসেননি; বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরতেই এসেছেন।
নিজের নির্বাসনের প্রসঙ্গ টেনে তসলিমা বলেন, ১৯৯৪ সালের ৮ আগস্ট তাকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সরকার এলেও তার জন্য সেই দরজা আর খোলেনি। ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারও তাকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করেছিল বলে দাবি করেন তিনি।
বক্তব্যে কলকাতার সঙ্গে নিজের দীর্ঘ সম্পর্কের কথাও স্মরণ করেন তসলিমা। তিনি বলেন, এক বাংলায় তার জন্ম, আরেক বাংলায় তিনি হারানো ঘরের সন্ধান পেয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত দুই বাংলার কোথাও তার স্থায়ী ঠিকানা হয়নি। ইউরোপ তাকে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও আশ্রয় দিলেও সেটি কখনো নিজের ঘর হয়ে ওঠেনি।
অনুষ্ঠানে ধর্মীয় মৌলবাদেরও সমালোচনা করেন তসলিমা। তিনি বলেন, কোনো ধর্ম বা মতাদর্শই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশেই সংবিধান, মানবাধিকার ও সমানাধিকারের ভিত্তিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের পক্ষে মত দেন তিনি।