ঐতিহ্যগতভাবে রাখিবন্ধন বা রাখি উৎসব হলো ভাই-বোনের পারস্পরিক ভালোবাসার বন্ধন উদযাপনের একটি উৎসব। তবে কালের পরিক্রমায় এই উদযাপনে এসেছে নতুনত্ব; লিঙ্গভেদ ভুলে বর্তমানে সব ভাই-বোনই এই সুদৃঢ় বন্ধন উদযাপন করে থাকেন। হিন্দু ধর্মাশ্রিত এই উৎসবটি যুগের পর যুগ ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ ও তাৎপর্য বহন করে এসেছে। বিশেষ করে পূর্ব ভারতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই রাখিবন্ধনকে কেবল ভাই-বোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা এবং ১৯০৫ সালে ব্রিটিশদের বঙ্গভঙ্গ ঠেকাতে হাতিয়ার হিসেবে প্রবর্তন করেছিলেন।
আজকের এই মেরুকৃত বিশ্বে, যেখানে ধর্ম ও গায়ের রঙের ভিত্তিতে প্রায়ই বিভাজনের রেখা টানা হয়, সেখানে ইতিহাসের এই একটি অধ্যায় ভারতে বিদ্যমান ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য স্মারক। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে কীভাবে এই পবিত্র সুতো ব্যবহার করা হয়েছিল, রাখি বন্ধনের দিনে ফিরে দেখা যাক সেই ইতিহাস।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বাংলায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চরম রূপ ধারণ করে, যা তৎকালীন ব্রিটিশ রাজ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন ধর্মীয় ভিত্তিতে অঞ্চলটিকে বিভক্ত করতে ‘বঙ্গভঙ্গ’-এর ঘোষণা দেন। এর মাধ্যমে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ে পূর্ব বাংলা ও আসাম এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ তৈরি করা হয়। প্রশাসনিক পুনর্গঠন বলা হলেও এটি মূলত ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রকে বিভক্ত করার অপচেষ্টা।
এর জবাবে নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ছক আঁকেন। শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা বা আবেদনের ওপর ভরসা না করে তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দিতে রাখিবন্ধন উৎসবকে বেছে নেন। এতদিন যা ছিল পারিবারিক পরিসরে বোনের হাতে ভাইয়ের রক্ষা পাওয়ার সুতো বাঁধার প্রথা, রবীন্দ্রনাথ তাকে রূপ দেন জনসমক্ষে সাম্প্রদায়িক সংহতি প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যমে।
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর, যেদিন বঙ্গভঙ্গ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়, সেদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পুরো বাংলায় ‘অরন্ধন’-এর ডাক দেন এবং শোক পালনের প্রতীক হিসেবে বাঙালিদের রান্নাঘর বন্ধ রাখতে বলেন। এরপর তিনি প্রদেশজুড়ে হিন্দু ও মুসলিমদের রাজপথে নেমে একে অপরের হাতে হলুদ রেশমি সুতো বা রাখি বেঁধে দেওয়ার আহ্বান জানান, যা তাদের অটুট ও পবিত্র ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে।
গঙ্গা নদীতে পুণ্যস্নান শেষে কলকাতার রাজপথে এক বিশাল শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দেন রবীন্দ্রনাথ নিজে। খালি পায়ে স্বদেশি গান গাইতে গাইতে এই শোভাযাত্রা প্রবেশ করে কলকাতার মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। রবীন্দ্রনাথ ও তার অনুগামীরা স্থানীয় মসজিদ, বাজারের দোকান ও বাসাবাড়িতে গিয়ে মুসলিম ধর্মগুরু, দোকানদার ও শ্রমিকদের হাতে রাখি বেঁধে দেন। এ সময় তিনি তার বিখ্যাত গান ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’ রচনা করেন, যা ধর্মীয় বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে এক যৌথ সাংস্কৃতিক পরিচয়কে জাগ্রত করে।
বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ঢাকা ও সিলেটেও একই ধরনের সম্প্রীতি মিছিলের আয়োজন করা হয়। রবীন্দ্রনাথের ঐক্যের গান গেয়ে যারা রাজপথে নেমেছিলেন, তাদের কাছে রাখি আর কেবল পারিবারিক বন্ধন ছিল না; বরং তা হয়ে উঠেছিল জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।
এভাবেই রাখি হয়ে ওঠে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক চাক্ষুষ প্রতিরোধ। ধর্মীয় ভিত্তিতে যে ঐক্যে ফাটল ধরানো যাবে না- রবীন্দ্রনাথের এই পদক্ষেপ ছিল তারই এক বলিষ্ঠ বার্তা। একটি সাধারণ সুতো বাঁধার মধ্য দিয়েই সূচনা হয় ‘স্বদেশি আন্দোলন’-এর, যা আর্থ-সামাজিক ও ধর্মীয় সীমারেখা ছাড়িয়ে সর্বস্তরের মানুষকে একত্রিত করতে সফল হয়।
পরবর্তীতে এই ধারাবাহিক গণচাপ ও সম্মিলিত আন্দোলনের মুখেই ১৯১১ সালে ব্রিটিশ মুকুট বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়।
বিভক্ত সম্প্রদায়কে একত্রিত করতে সাংস্কৃতিক প্রতীক ব্যবহারের এই ইতিহাস আধুনিক যুগে রবীন্দ্রনাথের এক মহান অবদান হয়ে রয়েছে। এককালে যা ছিল পারিবারিক উৎসব, সেই পবিত্র সুতোই শোষণের বিরুদ্ধে ও সম্প্রদায়ের মধ্যকার ফাটল রোখার প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছিল।
সূত্র: উইয়ন নিউজ