নিজেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট দাবি করা জুয়ান গুইদোকে স্বীকৃতি দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। দেশটির বামপন্থী সরকারকে উৎখাতে নিজের অবস্থান ঘোষণা করা ট্রাম্প ও তার সহ্যসহযোগীদের অবস্থানকে 'একটি বিপজ্জনক জুয়া খেলা' আখ্যা দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। মার্কিন সেনাবাহিনী পাঠানো হলে ভেনেজুয়েলায় নেমে আসবে ভয়াবহ দুর্যোগ। অন্যদিকে মাদুরোকে উৎখাতে ব্যর্থ হলে চরম অপমানিত হওয়া ছাড়া অন্য কোনও পথ খোলা থাকবে না। এমন বিপজ্জনক পট পরিবর্তনের খেলায় আদৌ কি সক্ষম ট্রাম্প প্রশাসন? যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মন্তব্য করা হয়েছে, যেসব মন্ত্রী ও উপদেষ্টাবেষ্টিত হয়ে আছেন ট্রাম্প, তারা তাকে যথাযথ পরামর্শ দিতে সক্ষম কি না তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। ট্রাম্পের সহযোগীদের 'নির্বোধের দল' আখ্যায়িত করেছেন আরেক ভাষ্যকার।
বৃহৎ তেলের মজুদ থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক বছর ধরে কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে ভেনেজুয়েলাকে। সম্প্রতি দেশটির সাধারণ মানুষকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কলম্বিয়া থেকে খাদ্যসহ অন্যান্য জরুরি সামগ্রী সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। আর্থিক দুর্দশা থেকে মুক্তি পেতে তাদের অনেকেই আশেপাশের দেশে অভিবাসী হওয়ার চেষ্টা করছেন।
এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছে নির্বাচন। তাতে জিতে দ্বিতীয় মেয়াদে দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন নিকোলাস মাদুরো। দেশটির বিরোধী দলসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নির্বাচনের বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ তুলেছে। বিরোধীদের এমন দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা। অর্থনৈতিক সংকটে জনগণের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে।
আর ব্যাপক এই বিক্ষোভের জেরেই গত বুধবার (২৩ জানুয়ারি) নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন বিরোধী দলীয় নেতা জুয়ান গুইদো। কয়েক মিনিটের মাথায় তাকে ‘স্বীকৃতি’ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট জুয়ান গুইদোকে আমি দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছি।’
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিয়েছেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশটিতে অবস্থানরত মার্কিন কূটনীতিকদের ভেনেজুয়েলা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। কিন্তু মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও কূটনীতিকদের সেই নির্দেশ অমান্যের আদেশ দিয়েছেন। এখন যদি যদি মাদুরো তাদের গ্রেফতার করার আদেশ দেন তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রেসিডেন্টের জন্য মাত্র দুইটি পথ খোলা থাকে। এর একটি হচ্ছে, দ্রুত দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, যার অর্থ মার্কিন সেনাবাহিনীকে সেখানে পাঠানো। এবং অপরটি, অপমানজনকভাবে পিছিয়ে যাওয়া।
গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধে সিমন টিসডাল মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্পের পাশে কোনও ভালো পরামর্শদাতা না থাকা এবং আগ্রাসী জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোলটনের উপস্থিতির কারণে ভেনেজুয়েলার জন্য বিপর্যয়কর পরিস্থিতি আনতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী পাঠানোটা জুয়া খেলার মতো কাজ হয়ে যাবে, যা যেকোনও সময় বিপরীত ফল ডেকে আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বিরোধিতা করলেও মাদুরো সমর্থন পেয়েছেন মেক্সিকো, তুরস্ক, রাশিয়া ও চীনের মতো দেশের। রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। অন্যদিকে, চীন গত বছর ভেনেজুয়েলাকে বিশাল বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছে।
এখন পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী গুইদোর পক্ষে গিয়েছে এমন কোনও সংবাদ পাওয়া যায়নি। সেক্ষেত্রে ট্রাম্প ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোলটন ধাক্কা খাবেন কারাকাসের নেতৃত্ব পাল্টানোর প্রথম শর্ত পূরণের ক্ষেত্রেই। আর সেটি হচ্ছে, বন্দুকধারীদের নিজেদের পক্ষে রাখা।
মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরাতে ট্রাম্পের প্রচেষ্টা যা-ই হোক, তার চারপাশে যারা আছেন, তারা কী সফলভাবে ট্রাম্পের ইচ্ছে বাস্তবায়ন করতে পারবেন? ট্রাম্প একে একে তার সব প্রখ্যাত পরামর্শকদের সরিয়ে দিয়েছেন। যেমন, সম্প্রতি সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিসকে বরখাস্ত করেছেন ট্রাম্প। সেনা প্রত্যাহার, ন্যাটোর বিরুদ্ধে কড়া মন্তব্য করাসহ অন্যান্য বেশ কিছু বিষয়ে দ্বিমতের জেরে ম্যাটিসের অবস্থান মিল ছিল না ট্রাম্পের ইচ্ছার সঙ্গে।
এখন যারা আছেন তাদের কারণে ট্রাম্পকে আগামী দিনগুলোতে ভুগতে হবে উল্লেখ করে সিমন টিসডাল লিখেছেন, মূলত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কী করা উচিত এবং কীভাবে করা উচিত সে বিষয়ে ট্রাম্পকে যথাযথ পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যক্তি হোয়াইট হাউসে আছে কি না তা নিয়ে তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
টিসডাল একজন মার্কিন ভাষ্যকারের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, ‘লিংকনের ছিল একদল প্রতিদ্বন্দ্বী। আর ট্রাম্পের সঙ্গে আছে একদল নির্বোধ।’ জেমস ম্যাটিসের স্থানে এখন রয়েছেন, প্যাট্রিক শ্যানাহান। তিনি ম্যাটিসের সহকারী ছিলেন। কিন্তু বোয়িংয়ের সাবেক এই কর্মকর্তার নেই কোনও সমরাস্ত্র বা কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা। ট্রাম্পের অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বারের কাজ দেখে মনে হয়, তার দায়িত্ব ট্রাম্প যা চান তা বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া। ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি সারাহ স্যান্ডার্স নিজে সংবাদমাধ্যমকেই অপছন্দ করেন। আর হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ মাইক মুলভেনি খোদ ট্রাম্পকেই ‘বিপজ্জনক মানুষ’ আখ্যা দিয়েছিলেন। এমন অবস্থায় ভেনেজুয়েলার পট পরিবর্তনের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরও বিগড়ে দিতে পারে।