মাদুরো না গুইদো: কাকে বেছে নেবে ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী

ভেনেজুয়েলার নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করে জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে নেওয়া প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে উৎখাতের ডাক দিয়েছেন জাতীয় পরিষদের নেতা হুয়ান গুইদো। একই সঙ্গে তিনি নিজেকে স্বঘোষিত অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবেও ঘোষণা করেছেন। সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা রাজপথে অবস্থান নেওয়ার পর দেশটির সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, মাদুরোকে উৎখাত করার জন্য। মাদুরো জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীর সমর্থন রয়েছে তার প্রতি। কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা গুইদোকে সমর্থনে মাদুরোকে উৎখাতের আহ্বান জানালেও সামরিক নেতারা এখনও মাদুরোকে সমর্থন করছেন। যুক্তরাষ্ট্রও সেনাবাহিনীকে আহ্বান জানিয়েছে মাদুরোকে উৎখাত করার জন্য। এই অবস্থায় দেশটির রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তোরণ ও ভবিষ্যতে কে সরকার গঠন করবে, তা নির্ধারণে সেনাবাহিনীর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। তবে সেনাবাহিনী মাদুরো না গুইদোকে সমর্থন জানাবে তা এখনও স্পষ্ট হয়নি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে।

AP_17237631716101

নির্বাচন ও প্রেসিডেন্টের বৈধতা ঘিরে ভেনেজুয়েলার চলমান সংকটের কারণ সম্পর্কে ক্ষমতা হস্তান্তর, অভ্যুত্থান বিষয়ক শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নৌনিহাল সিং জানান, অর্থনীতি ধসে পড়ার পর দুই বছর ভেনেজুয়েলার সরকার টিকে থাকবে তা অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু এই পরিস্থিতি অন্যত্র যেমন সৃষ্টি করা হয়, এখানেও তা হয়েছে। এটা শুধু জটিল হচ্ছে। কোনও দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলা ও লাখো মানুষকে দুর্ভোগে ফেলা কারও ইচ্ছা হওয়া উচিত না।

মাদুরো ও গুইদো উভয়েই নিজেকে ভেনেজুয়েলার বৈধ শাসক বলে দাবি করছেন। তাদের এই দাবির পক্ষে সামরিক নেতা, রাজনৈতিক নেতা, বিক্ষোভকারী ও বিদেশি সরকারও জড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকার উৎখাতের মতো সংকট পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া দেশগুলোতে এমন বিরোধ দেখা দেয়। কিন্তু বাস্তবে এই বিরোধ শুধু বৈধতা নিয়ে নয়। তারা শুধু খেলার চাল বিস্তৃত করছেন এবং সামরিক নেতা, বেসামরিক নেতা ও বিদেশি সরকারকে জানান দিচ্ছেন যে, দেশের ভাগ্য নির্ধারণে কার হাতে ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু যদি এসব শক্তি একত্রিত হয়ে তাদের কাউকে সমর্থন জানায় তবেই সফলতা আসে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন প্রভাবশালী শক্তিগুলো তাদের বিকল্প বিবেচনা করে তাদের সামনে থাকে, সেনা অভ্যুত্থান, ঐক্য সরকার, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর বা উভয় নেতাকে তাদের অবস্থানে রেখে দেওয়া। তারা নির্ধারণ করে কোনও বিকল্পটি তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং সফল হতে অন্যদের সমর্থন আদায় করে।

অধ্যাপক সিং বলেন, পরবর্তী বিকল্পকে ঢেকে রাখতে বৈধতার বিষয়টিকে ব্যবহার করা হচ্ছে, বিকল্প বেছে নেওয়ার জন্য নয়।

এই প্রক্রিয়াটাই ভেঙে পড়েছে ভেনেজুয়েলায়। দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো বিদেশি শক্তিগুলো সংঘাতরত এবং একের লাভে অন্যের ক্ষতি হওয়ার কারণে তারা ঐক্যে আসতে পারছে না। এমনকি ভেনেজুয়েলার নাগরিক; যে কোনও নতুন সরকার টিকে থাকতে এই নাগরিকদের বিক্রি করতে পিছপা হবে না, তারাও বিভক্ত। বিশেষ করে দরিদ্রদের অনেকেই এখনও মাদুরোর পূর্বসুরী হুগো চ্যাভেজের আদর্শ ধারণ করে। সেনাবাহিনীর একটা অংশ মাদুরোকে উৎখাতে সমর্থন দিলেও তাদের নেতারা তার প্রতি অনুগত।

উদাহরণ হিসেবে ইরানের শাহ ও মিসরের হোসনি মোবারকের কথা বলা যায়। তারা ক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়েছিলেন যখন দেশের প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো তাদের সরাতে একমত হয়েছিল। জনগণের বিদ্রোহকে পূঁজি করে তারা বৈধতা হারিয়েছেন বলে হাজির করা হয়।

গত সপ্তাহ থেকে ভেনেজুয়েলার কারাকাসে রাজপথের বিক্ষোভে জড়ো হওয়া জনগণকে গুইদো বলছেন, মাদুরো অবৈধ। কিন্তু এই মুহূর্তে গুইদো প্রভাবশালী ক্ষমতাচক্রকে বুঝাতে সক্ষম হননি যে তিনিই গ্রহণযোগ্য বিকল্প।

অনেকগুলো জটিল দাবির ফলে বৈধ বা অবৈধ, বিপ্লব বা অভ্যুত্থান, গণতন্ত্র রক্ষা বা ভূলুণ্ঠিতের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা টানা কঠিন। এর ফলাফলে অচলাবস্থা। দেশটির টিকে থাকা অসম্ভব মনে হওয়ার দুই বছর পর দেশটি আরও গভীর সংকটে পতিত হলো।

ভেনেজুয়েলার জটিল ক্ষমতার খেলায় সবচেয়ে স্পষ্ট আকারে হাজির হয়েছে সেনাবাহিনীর সমর্থন আদায়ে তাদের আহ্বান। মার্কিন সংবাদমাধ্যমে এক কলামে গুইদো লিখেছে, সরকার পরিবর্তনের জন্য মাদুরোর প্রতি সেনাবাহিনীর সমর্থন প্রত্যাহার জরুরি। তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত নন এমন সেনা কর্মকর্তাদের দায়মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

zW4qmyamH6

প্রকাশ্যে এমন ইঙ্গিত অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। কারণ এর ফলে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা তাকে। কিন্তু মাদুরোর পক্ষ থেকে সেনাবাহিনীর জন্য আরও বেশি সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি হয়ত, সেনাবাহিনীকে মাদক-পাচার নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য উপার্জনের সুযোগ দিতে পারেন। এতে করে সেনা কর্মকর্তার জন্য তার বিরুদ্ধে যাওয়া কঠিন করে তুলবে। কারণ, তারা জানে যে অন্য সরকার ক্ষমতায় আসলে তারা বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কৌশলটি সময়োপযোগী। পশ্চিম আফ্রিকার ছোট দেশ গাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ২০১৬ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। দেশটির নাগরিক, অভিজাত শ্রেণি ও বিদেশি সরকার তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু সেনাবাহিনী তাকে সমর্থন অব্যাহত রাখে। কারণ বিক্ষোভ দমনে সেনাদের ব্যবহার করেছেন তিনি। ফলে তিনি উৎখাত হলে তাদেরকে জেলে যেতে হবে। সেনাবাহিনীর এই অবস্থান এতোই শক্তিশালী ছিল যে, প্রতিবেশী দেশ সামরিক অভিযান না চালানো পর্যন্ত সংকটের অবসান হয়নি।

এই কারণেই সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বানে গুইদো দায়মুক্তি ও বিদেশি শক্তির সমর্থন পাওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা ঘোষণা করতে হচ্ছে গুইদোকে। ভেনেজুয়েলার সামরিক নেতারা মার্কিন সংবাদমাধ্যমে গুইদোর লেখা প্রকাশিত হওয়ার কারণে এটাকে যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা বলে ধরে নিতে পারেন।

কিন্তু এখন পর্যন্ত গুইদো বা মাদুরো কেউই সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষা পূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে পারেননি। কয়েকজন কর্মকর্তা বিদ্রোহ করার পর পূর্ণ বিদ্রোহের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কিন্তু শীর্ষ জেনারেলরা গুইদোর পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন না। আবার সেনাবাহিনীর ওপর এতো নিয়ন্ত্রণ নেই মাদুরোর যে বিক্ষোভ দমনে রাজপথে তাদের মোতায়েন করবেন।