সোমবার থেকে সিরিয়ার অস্ত্রবিরতি কার্যকর হয়ে গেলেও জাতিসংঘ অভিযোগ করেছে দাবি অনুযায়ী আলেপ্পো নগরীতে ত্রাণ পৌঁছাতে দিচ্ছে না সিরিয়া। জাতিসংঘের দাবি, তাদের ২০টি ত্রাণবাহী যান আটকে দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি স্টাফেন ডি মিস্তুরা বলেন, ‘অস্ত্রবিরতি চুক্তিতে বলা হয়েছে, যে কোনও ধরনের ত্রাণ পৌঁছাতে হলে তা কেবল সিরিয়া সরকারকে জানালেই চলবে। জাতিসংঘের অপেক্ষমাণ ২০টি ট্রাকের ত্রাণসামগ্রী সম্পর্কে সিরিয়া সরকারকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। ত্রাণ পৌঁছাতে সিরিয়া সরকারের অনুমতি বা সরকারি কর্মকর্তাদের পরিদর্শন বা পর্যবেক্ষণ জরুরি নয়।’
সিরিয়া সরকার বাধাহীন ত্রাণ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে জানিয়ে মিস্তুরা বলেন, ‘ট্রাকগুলো নড়ছে না, আমাদের এ নিয়ে আরও কাজ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অস্ত্রবিরতির প্রথম ২৪ ঘণ্টায় সহিংসতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে।’
তিনি পূর্ব আলেপ্পো কাউন্সিলের প্রতি পূর্বশর্তগুলো ত্যাগ করে ত্রাণ সরবরাহ করতে দেওয়ার আহ্বান জানান।
জাতিসংঘ প্রতিনিধির মন্তব্যটি প্রকারান্তরে রাশিয়ার প্রতি এক ধরণের ইঙ্গিত বলেই মনে করা হচ্ছে। আসাদ সরকারের ওপর রাশিয়াকে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে পূর্ব আলেপ্পোতে ত্রাণ প্রবেশের ব্যবস্থা করার জন্য ইঙ্গিত দিয়েছেন জাতিসংঘ প্রতিনিধি।
ডি মিস্তুরা দাবি করেন, আলেপ্পোতে ত্রাণ পৌঁছানোর প্রক্রিয়া সিরিয়ার অন্যান্য অংশের চেয়ে আলাদা। কেননা সিরিয়ার অন্যান্য অংশে ত্রাণ সরবরাহ করতে গেলে কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুমতিপত্র প্রয়োজন হয়। মাসের পর মাস জাতিসংঘকে এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, সিরিয়ার ক্ষমতাসীন বাশার আল-আসাদ সরকার এক বিবৃতিতে সতর্কবার্তা জানিয়ে বলেছে, তুরস্ক থেকে আসা কোনও ত্রাণ অনুমতি ছাড়া অবরুদ্ধ আলেপ্পো নগরীতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
আসাদ সরকারের বিরোধী গোষ্ঠীগুলো অভিযোগ করেছে, আলেপ্পোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্যাস্টেলো রোডে এখনও রাশিয়ান বাহিনী অবস্থান করছে। ওই সড়কটি বিভক্ত নগরীতে ত্রাণ নিয়ে পৌঁছানোর অন্যতম প্রধান পথ। নগরীতে প্রায় আড়াই লাখ বাস করছে। যাদের প্রয়োজনীয় খাবার, ওষুধ ও রসদের অভাব রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ান বাহিনীরও ক্যাস্টেলো রোডের কিছু ফাঁড়ির দখল নেওয়ার কথা।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানান, সিরিয়া সরকার ও কুর্দি বিদ্রোহীরা উভয়েই ক্যাস্টেলো রোড হয়ে ত্রাণ পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে যেনও জাতিসংঘ ত্রাণ নিয়ে আলেপ্পোতে পৌঁছাতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা রাশিয়াকে দিয়ে সিরিয়াকে চাপ দিতে গিয়ে আজ অনেক সময় নষ্ট করেছি। জাতিসংঘ যাতে সরকারি বাধা ও বিদ্রোহীদের হুমকি ছাড়াই ত্রাণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।’
ওই মার্কিন কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বিরোধী দলগুলোর কোনও একটি যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা অস্ত্রবিরতি মানবে না, তাহলেই তারা হামলা চালাবে।’
এর আগে রাশিয়া দাবি করেছে, তারা সিরিয়ার সঙ্গে মিলিতভাবেই অস্ত্রবিরতি মানছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি অনুসারে নিজেদের সমর্থিত বিদ্রোহীদের থামাচ্ছে না। রাশিয়ার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত বিদ্রোহীরা অস্ত্রবিরতির পর অন্তত ২৩ টি ক্ষেত্রে শর্ত ভঙ্গ করেছে। রাশিয়ার সেনা কর্মকর্তা এক টেলিভিশন বক্তব্যে বলেন, ‘সিরিয়া সরকারের বাহিনীগুলো সম্পূর্ণভাবে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করেছে, শুধু যেখানে ইসলামিক স্টেট (আইএস) ও আল কায়েদার তৎপর রয়েছে সেখানেই তারা যুদ্ধ করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একই কথা বলা যাচ্ছে না। অস্ত্র বিরতির পর এ পর্যন্ত অন্তত ২৩টি আবাসিক এলাকা ও সরকারি সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি করেছে মার্কিন সমর্থিত বিদ্রোহীরা।’
মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর জেনেভায় স্বাক্ষরিত অস্ত্রবিরতি কার্যকর শুরু হয় সোমবার সন্ধ্যায়। এ চুক্তি যদি এক সপ্তাহ কার্যকর থাকে তাহলে আইএস ও আল-নুসরা ফ্রন্টের (সাবেক জাবাত ফতেহ আল-শাম) বিরুদ্ধে রুশ-মার্কিন যৌথ অভিযানের জন্য হবে অভূতপূর্ব যৌথ প্রয়াস। মার্কিন সরকার চায়, আল-নুসরা ফ্রন্টের বিরুদ্ধে লড়াই সিরীয় বিমানবাহিনী নিষ্ক্রিয় থাকবে ও আসাদবাহিনী অভিযান চালাবে না।
মার্কিন-রুশ চুক্তির মধ্যে সিরীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়ে গেছে জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘এই সাতদিন যদি অস্ত্রবিরতি বিরাজ করে, তবে শান্তি বজায় থাকবে। কেবল আইএস ও আল-নুসরার বিরুদ্ধে যুদ্ধ জারি থাকবে। অস্ত্রবিরতি শেষ হলে যৌথ বাস্তবায়ন কেন্দ্র গঠিত হয়ে গেলে পরে আর বিরোধী অধ্যুষিত অঞ্চলেও আল-নুসরার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবে না সিরিয়া।’
কিন্তু তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে সিরিয়া আল নুসরার সঙ্গে যুদ্ধ করার অজুহাতে বিরোধীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। সহিংসতা কমিয়ে আনার জন্য সাত দিন সময় দরকার। এর মধ্যে যদি সহিংসতার ঘটনা ঘটে, তাহলে আমরা যৌথ বাস্তবায়ন কেন্দ্র (জিআইসি) পাব না।’
সিরিয়ায় প্রায় ২০ টির মতো বিরোধী গ্রুপ রয়েছে যারা অস্ত্রবিরতি মানতে রাজি নয়। তাদের দাবি, এটা স্পষ্টতই শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে জারি করা হয়েছে। অনেক গ্রুপ আল-নুসরা ফ্রন্টের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙতে সাবধানতা অবলম্বন করছে। কিন্তু লন্ডন থেকে সিরিয়ান ন্যাশনাল কোয়ালিশনের প্রেসিডেন্ট আনাস আল আব্দাহ জানান, তার বিশ্বাস বেশিরভাগ বিদ্রোহীরাই অস্ত্রবিরতি মেনে নেবে। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় দলগুলো আল নুসরা থেকে সরে যাবে, বিশেষত এই সাতদিনে। কারণ আল নুসরা রাশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আক্রমণের শিকার হতে যাচ্ছে।’
এদিকে টেলিভিশন ব্রিফিং থেকে জানা গেছে, রাশিয়ান সেনাবাহিনী দেখেছে বিদ্রোহীরা আলেপ্পো, দামেস্ক, ইদলিব ও দারাসহ বেশ কিছু স্থানে সহিংসতা চালাচ্ছে। এক রাশিয়ান সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘দিনভর নতুন ধরনের সহিংসতা ঘটেছে সিরিয়া জুড়ে। ক্যাস্টেলো রোড জুড়ে গোলাগুলি অব্যাহত রয়েছে।’
উল্লেখ্য, সিরিয়ায় ২০১১ সালের মার্চ থেকে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে দুই লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ঘরহারা হয়েছেন ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। সিরিয়ার চলমান সংকট নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বিপরীতমুখী। বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এ জন্য তারা আসাদ সরকারের বিদ্রোহ ঘোষণাকারী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সামরিক সহযোগিতা করছে।
অভিযোগ রয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে বিমান হামলার নামে সরকারি বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে। আর রাশিয়া বাশার আল আসাদকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। তারা আসাদ সরকারের সমর্থনে আইএস ও বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধকে মার্কিন-রুশ ‘ছায়াযুদ্ধ’ বলেও মনে করছেন অনেকে। এছাড়া আইএস ও কুর্দি বিদ্রোহীদের দমনে রাশিয়ার অভ্যন্তরেও সামরিক শুরু করেছে তুরস্ক।
১০ সেপ্টেম্বর (শনিবার) গৃহযুদ্ধ কবলিত সিরিয়ায় কয়েক বছর ধরে চলে আসা সহিংসতা বন্ধে প্রেসিডেন্ট আসাদের ঘনিষ্ট মিত্র রাশিয়া এবং বিদ্রোহীদের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র একমত হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর জেনেভায় মার্কিন পররাশট্রমন্ত্রী জন কেরি এবং রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ অস্ত্রবিরতি চুক্তির ঘোষণা দেন। ওই চুক্তির শর্ত ছিল, সোমবার সূর্যাস্তের পর থেকে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী এবং বিদ্রোহীরা পরস্পরের ওপর হামলা চালানো থেকে বিরত থাকবে। এ ছাড়া আইএস ও জাবাথ ফাতেহ আল-শাম (সাবেক আল-নুসরা ফ্রন্ট) প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া যৌথভাবে হামলা চালাবে। সেই সঙ্গে আসাদ বাহিনী ও বিদ্রোহীরা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কোনও হস্তক্ষেপ করবে না। সূত্র: রয়টার্স।
/ইউআর/এএ/