দ্রুজদের রক্ষায় হামলার পর ইসরায়েল-সিরিয়া উত্তেজনা

ইসরায়েল সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ সুইদায় বিমান হামলা জোরদার করেছে। সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে ‘বিশ্বাসঘাতকতামূলক আগ্রাসন’ ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের নির্লজ্জ লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের বিপরীতে যায়। তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড এ খবর জানিয়েছে।

সিরীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে চলমান বাইরের আগ্রাসন ও হস্তক্ষেপের জঘন্য উদাহরণ।

সুইদায় দ্রুজ ও বেদুইন গোষ্ঠীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্যেই মঙ্গলবার থেকে  ইসরায়েলি বিমান হামলা শুরু হয়। এই সংঘর্ষে রবিবার থেকে অন্তত ৩০ জন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে।

সিরিয়ার সরকার ও দ্রুজ সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানালেও ইসরায়েল এ অঞ্চলে একাধিক হামলা চালিয়েছে। যদিও তারা দাবি করে, দ্রুজদের রক্ষার স্বার্থেই এই অভিযান।

সুইদা প্রদেশে বসবাসরত দ্রুজরা একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তাদের ধর্ম শিয়া ইসলামের ইসমাইলি ধারার একটি উপশাখা থেকে উদ্ভূত। সম্প্রদায়টি মূলত সুইদা, দামেস্কের আশেপাশের উপশহর এবং ইসরায়েলের একটি অংশে ছড়িয়ে আছে।

সিরিয়ার সরকার তাদের রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তির আশ্বাস দিলেও সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরে মতবিভেদ রয়েছে—কেউ কেউ সরকারের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে, কেউ আবার সশস্ত্র প্রতিরোধে বিশ্বাসী।

বেদুইনদের একটি চেকপয়েন্টে এক দ্রুজ ব্যক্তিকে লাঞ্ছনা ও তার মালামাল লুটের অভিযোগ থেকেই উত্তেজনা ছড়ায়। পাল্টাপাল্টি অপহরণ ও সংঘর্ষের জেরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

সরকারি বাহিনী এলাকা নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎপর হলেও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ চলছে। সরকার এই সহিংসতার জন্য ‘বহিরাগত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’কে দায়ী করে কারফিউ জারি করেছে।

সিরিয়া বলছে, শুধু সুইদা নয়, সম্প্রতি ইসরায়েল দক্ষিণাঞ্চলের কুনেইত্রা ও দারা প্রদেশে অন্তত ১০টি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। এটি ১৯৭৪ সালের সীমানা বিচ্ছিন্নকরণ চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ইসরায়েল এই ঘাঁটিগুলো কৌশলগত পাহাড় ও সড়কে চৌরাস্তার কাছে তৈরি করেছে। এতে আশপাশের গ্রামগুলোর ওপর নজরদারি সহজ হয়েছে, তবে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলেও ইসরায়েলের এই হামলায় প্রকাশ্যে সমর্থন জানায়নি। বরং হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, আমরা ইসরায়েলকে সামরিক অভিযান থামানোর অনুরোধ করেছি।

ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর পরোক্ষ আলোচনার কথা স্বীকার করেছে দামেস্ক। তবে প্রত্যক্ষ আলোচনা হয়েছে কি না, তা নিয়ে মন্তব্য করেনি।

ইসরায়েলের প্রবাস বিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি মঙ্গলবার সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারাকে ‘নিশ্চিহ্নের’ আহ্বান জানান, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।

সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব সম্মান করুন এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করুন।

তারা আরও বলেছে, সিরিয়ার নাগরিকদের উচিত সহিংসতা পরিহার, অবৈধ অস্ত্র হস্তান্তর এবং জাতিগত বিভাজন রোধে সচেষ্ট হওয়া।

প্রসঙ্গত, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে হস্তক্ষেপ করছে। তবে সুইদার সাম্প্রতিক এই অভিযান পরিস্থিতিকে এক নতুন কূটনৈতিক ও সামরিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।