ড্রাম আর পিতলে তৈরি বাদ্যযন্ত্রের শব্দে মুখরিত মেঞ্জার স্কয়ার। পরিচ্ছন্ন ইউনিফর্মে মার্চ করে এগিয়ে চলেছে ফিলিস্তিনি স্কাউট দলগুলো। তাদের কণ্ঠে বড়দিনের ক্যারল আর ঐতিহ্যবাহী সুর। দীর্ঘ দুই বছর পর যিশুখ্রিষ্টের জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত বেথলেহেমের অলিগলিতে এভাবেই ফিরল বড়দিনের আমেজ। তবে এই উদযাপনে আনন্দের পাশাপাশি মিশে ছিল স্বজন হারানোর গভীর বেদনা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
বুধবার বড়দিনের আগের রাতে (ক্রিসমাস ইভ) আয়োজিত এই উৎসবে ফিলিস্তিনিদের জাতীয় পরিচয় আর ধর্মীয় আবেগ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। গাজা যুদ্ধের কারণে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে এখানে সব ধরনের উৎসব বন্ধ ছিল।
অবরুদ্ধ পূর্ব জেরুজালেম থেকে আসা জর্জ জালুম আল-জাজিরাকে বলেন, আজকের পরিবেশটা ঠিক অর্ধেক আনন্দ আর অর্ধেক বিষাদের। একদিকে আমরা বড়দিন উদযাপন করছি, অন্যদিকে গাজায় আমাদের ভাইয়েরা এখনও বোমাবর্ষণে প্রাণ হারাচ্ছে। আমরা চাই যুদ্ধ থামুক, শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক।
গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে গত দুই বছরে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহতের শোক এখনও তাজা। এমনকি উৎসব শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেও নিকটবর্তী শরণার্থী শিবির থেকে তিন তরুণকে গ্রেফতার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
জেরুজালেমের ল্যাটিন প্যাট্রিয়ার্ক পিয়েরবাত্তিস্তা পিজাবাল্লা এই উৎসবে যোগ দেন। সম্প্রতি গাজা সফর করে আসা এই শীর্ষ ক্যাথলিক ধর্মগুরু বলেন, গাজায় আমি কেবল ধ্বংসস্তূপ দেখেছি। কিন্তু সেই ধ্বংসের মাঝেও মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য আকুতি আমাকে মুগ্ধ করেছে। তারা আমাদের শিখিয়েছে যে সবকিছু আবার নতুন করে গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা বেথলেহেম ও গাজায় আবারও উৎসব করব।
উৎসবের আমেজ থাকলেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তল্লাশিচৌকি বা চেকপোস্টের কারণে সাধারণ মানুষের পথ ছিল বেশ দুর্গম। রামাল্লার কাছের বিরজিট গ্রাম থেকে আসা হুসাম জুরাইকাত জানান, অল্প দূরত্বের পথ হলেও চেকপোস্টে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে তাদের। তবুও শেষ পর্যন্ত আসতে পেরে তিনি খুশি।
বেথলেহেমের মেয়র মাহের কানাওয়াতি বলেন, বেথলেহেমের আজকের বার্তা হলো অবিচল থাকা এবং আশাবাদী হওয়া। আমরা বিশ্বকে দেখাতে চাই যে ফিলিস্তিনিরা শান্তি ও জীবনকে ভালোবাসে। তাদের শেকড় থেকে কেউ বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বেথলেহেমের হোটেলগুলো পর্যটকদের জন্য আবার খুলেছে। ফিলিস্তিনি হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান ইলিয়াস আল-আরজা জানান, এ বছর পর্যটন খাতে প্রায় ৩০ কোটি ডলার লোকসান হয়েছে। তবে বড়দিনের উৎসবে হোটেলগুলোর ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকড হয়েছে, যা কিছুটা হলেও আশার আলো দেখাচ্ছে।
উৎসবে আসা বিদেশি পর্যটকদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা থেকে আসা ডোয়াইন জেফারসন বলেন, বড়দিনের এই উদযাপন এই অঞ্চলে স্বাভাবিক জীবন ফেরার পথ খুলে দিতে পারে।
ইতালির পর্যটক জঁ চার্লসের মতে, এখানে মুসলিম-খ্রিষ্টান উভয় ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ ফিলিস্তিনের ভবিষ্যতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসায়ীরা এখনও পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছেন না। স্যুভেনিয়ার শপ মালিক জ্যাক জাকমান বলেন, এখনও সত্যিকারের বড় পর্যটক দল আসতে শুরু করেনি। আমরা প্রার্থনা করি এই অবরোধের অবসান হোক, যাতে বেথলেহেম এই বিশাল কারাগার থেকে মুক্তি পায়।