গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চলতে থাকায় ইসরায়েলের সেনাদের মধ্যে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) ও আত্মহত্যার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। এতে দেশটির সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
ইসরায়েলের উত্তর পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এমেক মেডিকেল সেন্টারের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রোনেন সিদি বলেন, “যুদ্ধক্ষেত্রে নেওয়া অনেক তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত সঠিক হয়, কিন্তু কিছু সিদ্ধান্ত ভুলও হয়। দুর্ঘটনাবশত নারী ও শিশু আহত বা নিহত হলে নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি করার অনুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন, এবং সেটি আর সংশোধন করা যায় না।”
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সেনাদের মধ্যে পিটিএসডি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, ২০২৮ সালের মধ্যে এই সংখ্যা আরও ১৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। যুদ্ধজনিত আঘাতে চিকিৎসাধীন ২২ হাজার ৩০০ সেনার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই যুদ্ধ-পরবর্তী ট্রমায় ভুগছেন। দেশটির বড় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ম্যাকাবি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে তাদের অধীনে চিকিৎসাধীন সামরিক সদস্যদের ৩৯ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিয়েছেন।
ইসরায়েলি পার্লামেন্টের একটি কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ২৭৯ জন সেনা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। ২০২৪ সালের এক জরিপে দেখা যায়, ইসরায়েলি জনগোষ্ঠীর আত্মহত্যার চেষ্টাকারীদের মধ্যে যুদ্ধরত সেনাদের অনুপাত ছিল ৭৮ শতাংশ। ফলে, ইসরায়েলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েছে এবং মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ার কারণে অনেক সেনা সহায়তা নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় দায়িত্ব পালন করা রিজার্ভ সেনা পল বলেন, যুদ্ধের মানসিক প্রভাব বাড়ি ফেরার পরও তাকে তাড়া করে বেড়ায়। তিনি এখনো গুলির শিসের শব্দ শোনার অনুভূতি পান। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা কমলেও তিনি সবসময় সতর্ক অবস্থায় থাকতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান।
একাধিক ফ্রন্টে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন অব্যাহত থাকায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। গাজার কিছু অংশ ও দক্ষিণ লেবাননে এখনো সক্রিয় রয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতার পর সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলেও তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের হিসাবে এক হাজার ১০০ জনের বেশি সেনা নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে গাজা ও লেবাননের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গাজায় ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি এবং দক্ষিণ লেবাননে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছেন। ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক সংকট এই অঞ্চলের মানসিক বিপর্যয়কে আরও গভীর করে তুলেছে।