ইসরায়েল কর্তৃক আটক গাজা অভিমুখী ত্রাণ বহর সুমুদ্র ফ্লোটিলা অ্যাক্টিভিস্টদের হাত বেঁধে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রেখে উপহাস করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছেন ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির। এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল এ খবর জানিয়েছে।
ভিডিও ক্লিপটিতে দেখা গেছে, আশদোদ বন্দরে কয়েক ডজন অ্যাক্টিভিস্টকে হাত বাঁধা অবস্থায় মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করা হয়েছে, যেখানে তাদের দেশান্তরের প্রক্রিয়া চলছিল।
ভিডিওটির শুরুতে দেখা যায়, এক নারী অ্যাক্টিভিস্ট ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ বলে চিৎকার করছেন। সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তার মাথা চেপে ধরে মাটিতে ফেলে দেন এবং মন্ত্রী বেন গভিরের হাঁটার পথ থেকে তাকে টেনেহিঁচড়ে সরিয়ে নেন।
কয়েক ডজন হাত বাঁধা অ্যাক্টিভিস্ট মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা অবস্থায় বেন গভিরকে একটি বড় ইসরায়েলি পতাকা ওড়াতে এবং হিব্রু ভাষায় চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, ‘ইসরায়েলে স্বাগতম! এখানে আমাদের কর্তৃত্ব!’
আরেকটি দৃশ্যে দেখা যায়, লাউডস্পিকারে ইসরায়েলের জাতীয় সংগীত বাজানো হচ্ছে এবং বন্দিরা হাঁটু গেড়ে আছেন। এরপর বেন গভির এক হাত বাঁধা বন্দির দিকে তাকিয়ে ‘আম ইসরায়েল চাই’ (ইসরায়েল জাতি দীর্ঘজীবী হোক) বলে চিৎকার করেন, যিনি মন্ত্রীর সঙ্গে তর্ক করার চেষ্টা করছিলেন। পেছনে এক নারীর কান্নার আওয়াজ শোনা গেলেও বেন গভির সেখানকার রক্ষীদের উদ্দেশে বলেন, ‘ওদের চিৎকারে কান দেওয়ার দরকার নেই।’
আটকদের প্রতি এমন আচরণ বেন গভিরের অধীনস্থ কারাগারগুলোতে থাকা মারাত্মক সন্ত্রাসীদের সঙ্গে করা আচরণের সমতুল্য।
বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ
এই ঘটনার পর ইতালি ও স্পেনের সরকার জানিয়েছে, তারা নিজ নিজ দেশে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এই আচরণের জন্য তিরস্কার করবে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই ভিডিওটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন এবং মানুষের মর্যাদা লঙ্ঘনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো জানিয়েছেন, ফরাসি নাগরিকদের সঙ্গে এমন দুর্ব্যবহারের কারণে তিনিও প্যারিসে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছেন। তিনি লিখেছেনন, ‘এই ত্রাণ বহর নিয়ে যার যা-ই মতামত থাকুক না কেন, আমাদের নাগরিকদের সঙ্গে অবশ্যই সম্মানজনক আচরণ করতে হবে এবং দ্রুত মুক্তি দিতে হবে।’
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ুং জানিয়েছেন, আটককৃতদের মধ্যে তার দেশের নাগরিকও রয়েছেন। ইসরায়েলের এই কর্মকাণ্ডকে তিনি ‘সীমা ছাড়ানো’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এ ছাড়া স্পেন ও আয়ারল্যান্ডও বিবৃতি দিয়ে বেন গভিরের এই আচরণকে ‘দানবীয়’ এবং ‘ভীতিজনক’ বলে উল্লেখ করেছে।
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজের ক্যাবিনেট মন্ত্রীর সমালোচনা করে একটি বিরল বিবৃতি দিয়েছেন। নেতানিয়াহু বলেন, ‘হামাস সমর্থকদের উসকানিমূলক ত্রাণ বহরকে আমাদের জলসীমায় প্রবেশ করতে না দেওয়ার পূর্ণ অধিকার ইসরায়েলের আছে। তবে মন্ত্রী বেন গভির অ্যাক্টিভিস্টদের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করেছেন, তা ইসরায়েলের মূল্যবোধ ও রীতিনীতির সঙ্গে খাপ খায় না।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদোন সার তার ব্যক্তিগত এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে বেন গভিরকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করে লিখেছেন, ‘এই লজ্জাজনক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রের ক্ষতি করেছেন এবং এটিই প্রথম নয়। না, আপনি ইসরায়েলের মুখ নন।’
গাজার নৌ-অবরোধ ভেঙে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে গত সপ্তাহে তুরস্কের মারমারিস থেকে ৪৩০ জনেরও বেশি অ্যাক্টিভিস্ট নিয়ে এই ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ রওনা হয়েছিল। আয়ারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যাথরিন কনোলির বোনও এই বহরে ছিলেন। ২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে মার্কিন মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চললেও গাজায় এখনও সহায়তার তীব্র সংকট রয়েছে বলে সাহায্য সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা আদালাহ জানিয়েছে, অ্যাক্টিভিস্টদের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আশদোদ বন্দরে আটকে রাখা হয়েছে এবং তাদের দক্ষিণ নেগেভ মরুভূমির কেতজিওত কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কারাগারে না পৌঁছানো পর্যন্ত আদালাহ-র আইনজীবীরা তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না।
এই বহরের নেতৃত্বে ছিল তুরস্কের সাহায্য সংস্থা আইএইচএইচ, যাকে ইসরায়েল সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে গণ্য করে। মঙ্গলবার গাজা উপকূল থেকে প্রায় ১৬৭ মাইল দূরে ইসরায়েলি কমান্ডোরা এই বহরে চড়াও হয় এবং জাহাজে থাকা ক্যামেরাগুলো ভেঙে ফেলে। তুরস্ক এবং হামাস ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে ‘জলদস্যুতা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনেই কাজ করছে এবং ৪৩০ জন অ্যাক্টিভিস্ট তাদের নিজ নিজ দেশের কনস্যুলার প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাবেন।