ইরানের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাসের কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই পদক্ষেপের ফলে দেশটিতে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির এক দিন পর বৃহস্পতিবার বেসেন্ট এসব কথা বলেন।
ট্রাম্প ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ এবং ইরানকে কোনও প্রকার ‘সহায়তা প্রদানকারী’ যেকোনও দেশের বিরুদ্ধে মারাত্মক অর্থনৈতিক পরিণতির হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। আগামী সপ্তাহে নতুন এই নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের আর্থিক শাস্তির হুমকির পর বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, তেলের দাম কেন হঠাৎ বাড়ল, তা আমি নিশ্চিত নই। আমরা যদি সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করি, তবে এর অর্থ হলো সম্ভবত নতুন করে বড় কোনও সামরিক আক্রমণ চালাতে হবে না।
চলমান এই সংঘাতের ফলে ইতোমধ্যে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে ব্যবসা হওয়া জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করার মাধ্যমে নিজের সক্ষমতা দেখিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এপ্রিল ও জুনে দুইবার যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘোষণা করলেও উভয় চুক্তিই দ্রুত ভেস্তে যায়।
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে ইরান প্রায় অবিরত ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সহ্য করে আসছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী কথা বলার আগেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের এসব অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়ে একে অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তারা বলেছে, এসব পদক্ষেপ দেশের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরানিদের সংকল্প থেকে সামান্যতম বিচ্যুত করতে পারবে না।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে এই নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজের বিস্তারিত তুলে ধরা হবে জানিয়ে বেসেন্ট বলেন, আমরা ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধের পাশাপাশি ইতিহাসের কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছি। এটি ইরানে কার্যকর হবে এবং আমরা এই শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে যাচ্ছি। এখন আমাদের মিত্র ও বাকি বিশ্বের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।
অ্যানালিটিক্স ফার্ম কেপলারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের রফতানি করা তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কেনে চীন। মার্কিন অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ইরানকে ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কি না। জবাবে তিনি জানান, এসবের অনেক আলোচনা আড়ালেই হওয়া ভালো। তবে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীন দূতাবাস জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ প্রয়োগ সমস্যার সমাধান করে না। চীন কূটনৈতিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক বার্তায় ট্রাম্প নজিরবিহীন মাত্রার অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং একঘরে করার প্রতিশ্রুতি দেন। ট্রাম্প লিখেছিলেন, যেকোনও দেশ যদি তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থাকে ইরানের জন্য কোনও ধরনের সহায়তার সুযোগ দেয়, তবে তাদের নিজেদেরই ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
তবে যুদ্ধের কারণে অভ্যন্তরীণভাবে ট্রাম্প নিজেও চাপের মুখে রয়েছেন। জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে তার জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে, যা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দলের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষেত্রে হুমকি তৈরি করতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আর্থিক সমস্যা, যেমন রেকর্ড ঋণ ও সুদের হার বৃদ্ধি থেকে জনগণের দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের ব্যর্থ নীতির ধারাবাহিকতা তাদের আরও ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যাবে।
সূত্র: রয়টার্স