কী, কেন, কীভাবে

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা কি যুদ্ধাপরাধ? জাতিসংঘের তদন্তে যা উঠে এলো

জাতিসংঘের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত একটি তথ্য অনুসন্ধান মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে চালানো দুটি বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করে থাকতে পারে। এর মধ্যে একটি হামলা চালানো হয়েছিল মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং অন্যটি লারমেদের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল স্থগিত পারমাণবিক আলোচনার মাঝেই ইরানে যুদ্ধ শুরু করার পর ফেব্রুয়ারি মাসের ওই বিমান হামলাগুলোর দীর্ঘ মাসব্যাপী তদন্ত শেষে মানবাধিকার কাউন্সিলে এই প্রতিবেদন জমা দেয় ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তথ্য অনুসন্ধান মিশন। এতে বলা হয়েছে, হামলাগুলো পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্র ‘বেপরোয়াভাবে’ কাজ করেছে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি রয়েছে।

ওয়াশিংটন বা ইসরায়েল কেউই এই মিশনকে কোনও কর্মী বা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেনি, ফলে তদন্তকারীরা স্যাটেলাইট ইমেজ, যাচাইকৃত ভিডিও, অস্ত্র বিশ্লেষণ এবং ইরানি সূত্র ও স্বাধীন সংস্থার প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবৃতির ওপর নির্ভর করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিনাবের প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বেসামরিক হিসেবে স্পষ্ট দৃশ্যমান থাকা সত্ত্বেও সেখানে হামলা চালানোর সময় এটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু কিনা তা যাচাই করার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করার বাধ্যবাধকতায় ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার শুরুর সময়ে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হোরমোজগান প্রদেশের মিনাবের শাজারায়েহ তায়্যেবাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। স্কুলটি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর্পস (আইআরজিসি)-এর একটি নৌ সুবিধা থেকে প্রায় ৭২ মিটার দূরে হলেও একটি প্রাচীর দিয়ে আলাদা ছিল এবং এর নিজস্ব প্রবেশপথ ছিল। শিশুদের ম্যুরাল, খেলার মাঠ ও শ্রেণিকক্ষসহ এটি যে একটি সচল স্কুল, তা স্যাটেলাইট ইমেজেও স্পষ্ট দৃশ্যমান ছিল।

তদন্তকারীরা দেখতে পান স্কুলটিতে দুবার হামলা চালানো হয়েছিল। প্রথম হামলাটি নিচতলায় আঘাত হানে; এরপর কর্মীরা যখন শিশুদের ওপরের তলার একটি প্রার্থনা কক্ষে নিয়ে যান, তখন দ্বিতীয় হামলাটি ওপরের তলায় আঘাত হানে এবং বহু শিশুকে হত্যা করে।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে এই হামলায় ১২০ জন স্কুলছাত্রী ও ২৬ জন নারী শিক্ষকসহ ১৫৬ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে জাতিসংঘ মিশন যে স্বাধীন সূত্রের কথা উল্লেখ করেছে, তাতে নিহতের সংখ্যা ১৫৭ জন বলা হয়েছে, যার মধ্যে ছয় বছর বয়সী ১৫ জন শিশুও রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে ইরানি বাহিনীর ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করলেও ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া টুকরো টুকরো অংশ বিশ্লেষণ করে অস্ত্র বিশ্লেষকরা নিশ্চিত করেন যে হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইল, যা ইরানের কাছে নেই।

মিনাব হামলার একই দিনে অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় ফার্স প্রদেশের লারমেদের শহীদ হাজ খলিল নাইমি কালচারাল অ্যান্ড স্পোর্টস কমপ্লেক্সে বিমান হামলা চালানো হয়, যেটির কোনও সামরিক ব্যবহার ছিল না বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের মিশন। যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি ক্ষেপণাস্ত্র কাছাকাছি আবাসিক এলাকার ওপর বিস্ফোরিত হয় এবং দ্বিতীয়টি সরাসরি ওই কেন্দ্রের ঠিক ওপরে বিস্ফোরিত হয়। স্থানীয় কর্মকর্তারা চার শিশুসহ ২২ জনের মৃত্যুর খবর এবং শতাধিক আহতের কথা জানান। এছাড়া পাশের একটি স্কুলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য

মিনাব স্কুল হামলার ঘটনাস্থল থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রমাণ পাওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এই দায় অস্বীকার করেনি। গত ১৯ মে সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানান, পেন্টাগনের প্রাথমিক অনুসন্ধানে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে এই হামলার ‘মিল’ পাওয়া গেছে। জুনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন যে ‘কেউই’ উদ্দেশ্যমূলকভাবে স্কুলটিতে আক্রমণ করেনি।

নিউইয়র্ক টাইমস ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগনের একটি প্রাথমিক তদন্তে পুরোনো তথ্যকে এর জন্য দায়ী করা হয়েছে, যেখানে ভুলবশত স্কুলটিকে পাশের সামরিক স্থাপনার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

এদিকে লারমেদ হামলার দায় অস্বীকার করেছে ওয়াশিংটন। সেন্টকম দাবি করেছে যে সেখানকার ক্ষয়ক্ষতি ইরানের হোয়েইজেহ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে মিলে যায়। তবে মিশন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ডিজাইনের পার্থক্যের কারণে হোয়েইজেহ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহারের কোনও সুযোগ নেই; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল, যা যুক্তরাষ্ট্র এই প্রথম ইরানে ব্যবহার করেছে বলে প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রতিবেদনের ফলাফল অস্বীকার করেছে। হোয়াইট হাউসের ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আনা কেলি আল জাজিরাকে বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল মানবাধিকারের জন্য কিছুই করেনি, দশকের পর দশক ধরে অর্থহীন বোকামি ছড়াচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এই সংঘাতে একমাত্র পক্ষ যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে তা হলো ইরানি রেভল্যুশনারি রেজিম, যারা তাদের নিজেদের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে, বিদেশে আমেরিকানদের হত্যা করেছে, হরমুজ প্রণালিতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে এবং অঞ্চলে তাদের প্রতিবেশীদের ওপর নির্বিচার আক্রমণ চালিয়েছে।

ইরানের বক্তব্য

লারমেদ হামলায় মার্কিন অস্বীকৃতি প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরান জোর দিয়ে বলেছে যে এর জন্য দায়ী ক্ষেপণাস্ত্রটি ইরানি নয়, বরং মার্কিন এবং মিনাব ও লারমেদে ওয়াশিংটনের নির্বিচার হামলার প্রমাণ এটি।

মিনাবের প্রসিকিউটর ইব্রাহিম তাহেরি এবং লারমেদ কাউন্টির ক্রীড়া ও যুব বিভাগসহ ইরানি কর্মকর্তারা উভয় স্থানে হতাহতের নিজস্ব পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছেন, যেখানে মিনাবে ১৫৬ এবং লারমেদে ২২ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

যুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত করেছে বলে পূর্বেও অভিযোগ করেছে ইরান এবং এই হামলার জন্য আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা দাবি করেছে।

আইনগত প্রেক্ষাপট

আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী যেকোনও পক্ষকে সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করতে হয় এবং হামলা চালানোর আগে সমস্ত সম্ভাব্য সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ রিড ব্রডি আল জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধের আইনের প্রতিটি লঙ্ঘন যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। কোনও অপরাধের জন্য একটি উদ্দেশ্যমূলক উপাদান থাকতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে আঘাত হেনেছে এমন অভিযোগ কেউ করছে না। এর জন্য প্রাসঙ্গিক মানদণ্ড হলো ‘বেপরোয়া আচরণ’।

ব্রডি জানিয়েছেন, এই প্রতিবেদনের কোনও স্বয়ংক্রিয় আইনি পরিণতি নেই। তবে এটি গাম্বিয়ার বর্মা মামলা বা দক্ষিণ আফ্রিকার ইসরায়েল মামলার মতো অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তি তৈরি করতে পারে। জবাবদিহিতা শেষ পর্যন্ত আইনি কাঠামোর চেয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে কংগ্রেসে পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ ফলাফল প্রকাশ্যে আনার দাবি আরও জোরালো হতে পারে।

জাতিসংঘের এই মিশন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শত্রুতার অবিলম্বে অবসান ঘটানোর পাশাপাশি যুদ্ধপীড়িতদের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়েছে। 

সূত্র: আল জাজিরা