তুরস্কের ইস্তাম্বুলের বিশ্বখ্যাত গ্র্যান্ড বাজার প্রতি দিন প্রায় চার লাখ পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত থাকে। তবে ৬৫টি গলি, ১৪টি পান্থশালা এবং প্রায় ৩ হাজার ৬০০টি দোকানের এই জমকালো আর আলোকোজ্জ্বল জগতের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে আরেক রহস্যময় বিশ্ব, যা গত কয়েক শতাব্দী ধরে প্রায় অপরিবর্তিত।
৭৮ বছর বয়সী বর্ষীয়ান রত্ন ব্যবসায়ী উমিত বার্কসোই ইস্তাম্বুলের এই ঐতিহাসিক বাজারের ছোট ছোট কারখানাকে এর আসল সৌন্দর্য হিসেবে উল্লেখ করেন। ১৪৫৩ সালে বাইজেন্টাইনদের হারিয়ে কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের পর ২১ বছর বয়সী উসমানীয় (অটোমান) সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ এই বাণিজ্যিক জগতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘প্রকৃত দক্ষতা শহর গড়ে তোলায় এবং মানুষের হৃদয় জয় করায়’। শত শত বছরের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূমিকম্প সামলে এটি আজ তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
এখানে আর্মেনীয়, গ্রিক, ইহুদি ও সিরিয়াক সম্প্রদায়ের কারিগররা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। অর্থনীতিবিদ কেনান মোরতানের তথ্য অনুযায়ী, বাজারের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত জেনাহির বেদেস্তেনির শিলালিপিতে লেখা রয়েছে, ‘মুনাফা হলো বাতাসে উড়ে বেড়ানো এক বুনো পাখি। যদি চতুরতার সঙ্গে তাকে শিকার করতে পারো, তবেই সমৃদ্ধি আসবে।’
গ্র্যান্ড বাজারের অন্যতম পুরোনো অ্যান্টিক দোকান ইপোক-এর ৭৬ বছর বয়সী কারিগর গেটভার্ট তেমিনিয়ান বলেন, ‘অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আজকাল অনেকেই নিজেদের দামি জিনিস বিক্রি করতে আসেন। তবে প্রতিটি পতনেরই একটি প্রত্যাবর্তনের পথ থাকে, আর আমরা সেটার জন্যও এখানে থাকব।’
আর্মেনীয় সম্প্রদায়ের জহুরি সেভান হারুনিয়ান (৫৪) দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী স্বর্ণ ও রত্নের কাজ করছেন। তার কর্মশালার জানালা দিয়ে ২০১২ সালের জেমস বন্ডের ‘স্কাইফল’ সিনেমার সেই দৃশ্যপট দেখা যায়। তিনি জানান, গুরু-শিষ্যের এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখা তাদের দায়িত্ব।
২০১৭ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, গ্র্যান্ড বাজারের ৫৩২টি জুয়েলারি দোকানের জন্য ৫৭ জন মূল ওস্তাদ কাজ করেন। তাদেরই একজন ৬৬ বছর বয়সী হ্রান্ত জোরবাস, যিনি রত্ন বসানোর কাজ করেন। তার ছেলে শান্ত জোরবাস বলেন, ‘মানুষের জীবনযাত্রা এবং বিলাসিতার ধারণা নাটকীয়ভাবে বদলে গেলেও এখনও হাতে তৈরি গহনার কদর বোঝার মতো মানুষ রয়েছে।’
কারখানায় তৈরি গহনার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী এই কারিগরির তুলনা করে রত্ন ব্যবসায়ী উমিত বার্কসোই মুগ্ধতার সঙ্গে বলেন, কোনও কারখানায় তৈরি আংটি কি এই সৌন্দর্যের সমকক্ষ হতে পারে? এটিই হলো গ্র্যান্ড বাজারের আসল আত্মা।
সূত্র: সিএনএন