ইয়েমেনজুড়ে তীব্র লড়াই, গভীর হচ্ছে মানবিক সংকট

ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী ও হুথি যোদ্ধাদের মধ্যে একাধিক রণাঙ্গনে লড়াই তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিতে মানবিক সংকট ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। শনিবার সরকারঘেঁষা তুর আল-বাহা সামরিক অক্ষ এক বিবৃতিতে জানায়, লাহিজ প্রদেশের আল-মাকাতিরাহ রণাঙ্গনে ভারী সংঘর্ষে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুগত আট জন সেনা নিহত হয়েছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।

এদিকে সংঘাতের মানবিক মূল্য বাড়ছে। মানবিক সংস্থাগুলো বেসামরিক মানুষের পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে লড়াই বাড়ার পর থেকে ২ লাখ ৩৩ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শুধু তাইজ প্রদেশেই প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার।

তাইজ প্রদেশে সরকারি সেনারা জানায়, আল-আকরুদে তারা ১২ হুথি যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। তাইজ শহরের উপকণ্ঠে কয়েক দিন ধরে লড়াই চলছে। সেখানে সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে দিয়েছে এবং গোষ্ঠীটির ব্যাপক ক্ষতি করেছে বলে জানিয়েছে।

তাইজের অন্যত্র সরকারি বাহিনী জানায়, আল-শাকাব রণাঙ্গনে হুথিদের হামলা তারা ভেঙে দিয়েছে। সরকারপন্থি হোমল্যান্ড শিল্ড ফোর্সেস আল-ওয়াজিয়ায় ড্রোন হামলায় হুথিদের একটি সরবরাহ যান ধ্বংসের কথা জানিয়েছে। সাদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেডস জানায়, লাহিজ সীমান্তের কাছে আল-মাদারিবায় তারা হুথিদের অবস্থানে নিখুঁত হামলা চালিয়েছে।

এদিকে সরকারি সেনা ও মিত্র পপুলার রেজিস্ট্যান্স যোদ্ধারা আল-জাওফ ও মারিবে তাদের আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। সামরিক কর্মকর্তারা জানান, আল-জাওফে হুথিদের সামরিক অবস্থান, ব্যারাক ও সেনা সমাবেশে কামানের গোলাবর্ষণ ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। জোটের বিমান হুথিদের কমান্ড কেন্দ্র ও সরবরাহ ডিপোতে বোমা ফেলেছে। মারিবেও হুথিদের সারিতে সরকারি কামান ও ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট হামলা চালিয়েছে।

গত মাসে লোহিত সাগর উপকূলে সরকারপন্থি বাহিনীর কাছ থেকে কৌশলগত ভূখণ্ড দখলের পর থেকে ইয়েমেনের যুদ্ধ তীব্রভাবে বেড়েছে। হুথিরা আনসার আল্লাহ  নামেও পরিচিত। ক্ষতির জবাবে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং পরে ডন অব ইয়েমেন অভিযান শুরু করে। এ অভিযানের লক্ষ্য ইরানপন্থি গোষ্ঠীটির দখলে থাকা ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার, যার মধ্যে রাজধানী সানাও রয়েছে, যা ২০১৪ সালে হুথিরা দখল করে।

আকাশপথেও লড়াই চলছে। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, হাজ্জা প্রদেশের আকাশে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী সৌদি একটি রিকনিসান্স ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তিনি ড্রোনটিকে তুরস্কে তৈরি লেন্টাটেক কারায়েল হিসেবে শনাক্ত করে বলেন, সর্বশেষ উত্তেজনা শুরুর পর এ ধরনের ড্রোনের মধ্যে এটি চতুর্থ ভূপাতিত।

হুথিরা সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী প্রদেশ নাজরানে একটি সৌদি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার দাবিও করেছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র কর্নেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, নাজরানে একটি এএইচ-৬আই রিকনিসান্স হেলিকপ্টার কারিগরি ত্রুটির কারণে বিধ্বস্ত হয়ে দুই ক্রু নিহত হয়েছেন। হুথি গণমাধ্যম সাদা প্রদেশে বিভিন্ন স্থানে সৌদি বিমানের ১০টি হামলার খবরও দিয়েছে।

আল-মুকাল্লা উপকূলে ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানায়, একটি স্কিফে থাকা অন্তত সাত জন সশস্ত্র ব্যক্তি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) একটি ট্যাংকারে হামলা চালায়। তারা ট্যাংকারটির দিকে দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ে। জবাবে জাহাজের নিরাপত্তা দল দুটি সতর্কতামূলক গুলি ছুড়লে হামলাকারীরা গতিপথ বদলে সরে যেতে বাধ্য হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করেছে, তাইজ শহর কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সেখানকার ১২টি হাসপাতালে মাত্র চার দিনের জ্বালানি আছে, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম নেই এবং ক্রমবর্ধমান কলেরা প্রাদুর্ভাবের মধ্যে অক্সিজেন ও ওষুধের তীব্র সংকট রয়েছে।

বাস্তুচ্যুতির সংকট পূর্ব আফ্রিকায়ও ছড়িয়েছে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) নিশ্চিত করেছে, ৪ হাজারের বেশি শরণার্থী ওই অঞ্চলে পৌঁছেছেন, যাদের ৩ হাজার ৮০০ জিবুতিতে এবং প্রায় ২০০ জন সোমালিয়ায়। ইউএনএইচসিআর আরও জানায়, জিবুতির মারকাজি ক্যাম্পে কলেরা প্রাদুর্ভাবে স্বাস্থ্যকর্মীরা চিকিৎসা দিচ্ছেন, যেখানে ৩১ জন আক্রান্ত ও একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।