সীমান্তের দুই পাশেই সহিংসতা বৃদ্ধির মধ্যে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য কার্যক্রম স্থগিত করেছে পাকিস্তান। বেলুচিস্তান প্রদেশের তাফতান ও গাবদ-রিমন সীমান্ত ক্রসিংয়ে এই বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থগিতের ফলে সীমান্তের দুই পাশে অন্তত ২ হাজার পণ্যবাহী ট্রাক আটকা পড়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে কোয়েটা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (কিউসিসিআই)। তবে গাবদ-রিমন পয়েন্টে যাত্রী পারাপার স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানি বার্তা সংস্থা ওয়ানা।
সীমান্ত বন্ধের বিষয়ে পাকিস্তান ও ইরান ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। তাফতান ক্রসিং অবস্থিত যে চাগাই জেলায়, সেখানকার ডেপুটি কমিশনার বখতিয়ার ইসমাইল জানান, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান জোরদার ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা উন্নত করতেই সাময়িকভাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থা কার্যকর হলে এটি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা শাহিদ রিন্দও একই কথা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, নিরাপত্তা শঙ্কা দূর করা ও চোরাচালান রোধ করাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই তাসনিম ও আইআরএনএ বার্তা সংস্থাকে জানান, কারিগরি সমস্যা এবং কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হিসেবে সীমান্ত পারাপার ও বিনিময় সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। তবে সেন্টার ফর সাইন্টিফিক রিসার্চ অ্যান্ড মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক জাওয়াদ হেইরান-নিয়া বলেন, এ ধরনের পরিভাষা সাধারণত শুল্ক প্রক্রিয়া, বাণিজ্য কাগজপত্রের সত্যতা যাচাই বা আর্থিক লেনদেনের জটিলতাকেও নির্দেশ করে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি কৌশলগত কারণে পাকিস্তান এই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছিল। তবে পরবর্তীতে আমেরিকা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার এবং অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট ঘোষণা করলে পাকিস্তান গত আগস্টে সব প্রযোজ্য নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার ইঙ্গিত দেয়।
সীমান্ত বন্ধের পেছনে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ সহিংসতা ও জঙ্গি তৎপরতা অন্যতম প্রধান কারণ। পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে চলতি বছর নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বরে দেশজুড়ে ২২৫টি সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে, যা গত ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। চাগাই জেলাতেও সম্প্রতি কাস্টমস কর্মকর্তাসহ চার যাত্রী অপহৃত হন।
একইভাবে সীমান্তের অপর পাশে ইরানের সিস্তান-বলুচিস্তান প্রদেশেও গানম্যান ও উগ্রপন্থিদের হামলা বেড়েছে। গত ৯ অক্টোবর জাহেদানের কাছে এক পুলিশ কর্মকর্তা এবং ১৪ অক্টোবর আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের নারী ইউনিটের এক কমান্ডারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সুন্নি সশস্ত্র গোষ্ঠী জৈশ আল-অদল যৌথ জোট গঠন করে এসব হামলার দায় স্বীকার করেছে। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, গোষ্ঠীটি পাকিস্তান ভূখণ্ড ব্যবহার করে এসব হামলা চালাচ্ছে, যদিও ইসলামাবাদ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ রেজা হাশেমি জেবিলি জানান, তেহরান চায় পাকিস্তান যেন তাদের সীমান্তে ইরানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম বন্ধে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে। বিশ্লেষক জাওয়াদ হেইরান-নিয়ার মতে, সীমান্ত বন্ধের এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকার নিরপেক্ষতা নিয়ে তেহরানের মনে প্রশ্ন উঠতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা